রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় বাংলাদেশের কূটনীতিপাড়ায় এক বিশাল রদবদলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং কূটনৈতিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে নতুন পররাষ্ট্রসচিব নিয়োগের পাশাপাশি নিউইয়র্ক, লন্ডন, দিল্লি ও জেনেভার মতো শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
এর মধ্যে বিশ্ব রাজনীতির দুই অন্যতম কেন্দ্র নিউইয়র্ক ও লন্ডনে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায়।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সরকারের একজন নীতিনির্ধারক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ‘মুক্ত প্রভাত’-এর কাছে এই বড় পরিবর্তনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
শীর্ষ পদে রদবদল: এক নজরে নতুন মিশন প্রধানগণ
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ ৫টি শীর্ষ কূটনৈতিক পদে যে পরিবর্তনগুলো আসতে যাচ্ছে:
বর্তমান পদ/ব্যক্তি নতুন দায়িত্ব স্থলাভিষিক্ত হবেন যাঁর
সালাহউদ্দীন নোমান চৌধুরী পররাষ্ট্রসচিব, ঢাকা আসাদ আলম সিয়াম
(নিউইয়র্কে স্থায়ী প্রতিনিধি)
আসাদ আলম সিয়াম হাইকমিশনার, এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ
(বর্তমান পররাষ্ট্রসচিব) ভারত (নয়াদিল্লি)
আইরিন খান স্থায়ী প্রতিনিধি, সালাহউদ্দীন নোমান চৌধুরী
(আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী) জাতিসংঘ (নিউইয়র্ক)
এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ স্থায়ী প্রতিনিধি, নাহিদা সোবহান
(দিল্লিতে হাইকমিশনার) জাতিসংঘ (জেনেভা)
মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত হাইকমিশনার, শূন্য পদ (গত মার্চ থেকে খালি)
(রেক্টর, ফরেন সার্ভিস একাডেমি) যুক্তরাজ্য (লন্ডন)
নিউইয়র্ক ও লন্ডনে ‘রাজনৈতিক’ চমক
এবারের রদবদলের সবচেয়ে বড় চমক জাতিসংঘের নিউইয়র্ক সদর দপ্তরে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব আইরিন খান-এর নিয়োগ। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের এই বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার আগামী সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগেই নিউইয়র্কে দায়িত্ব নিতে পারেন।
রাজনৈতিক বিবেচনার আরেকটি বড় পদে, নিউইয়র্কে জাতিসংঘ মিশনে উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান (এপেলো)। এছাড়া লন্ডনে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হচ্ছেন অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত।
৫ দেশে নতুন রাষ্ট্রদূত: ফরেন সার্ভিসে বড় রদবদল
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ক্ষমতায় আসার পর থেকে পেশাদার কূটনীতিকদের মূল্যায়নের নীতি নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে নতুন করে ৫টি দেশে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে:
মরিশাস: নতুন রাষ্ট্রদূত হচ্ছেন এম ফরহাদুল ইসলাম (বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আন্ত সরকারি সংস্থাসমূহ)।
ডেনমার্ক: হাইকমিশনার হিসেবে যাচ্ছেন জকি আহাদ।
আয়ারল্যান্ড: নতুন রাষ্ট্রদূত নুর-ই আলম।
আর্জেন্টিনা: নতুন রাষ্ট্রদূত এ এফ এম জাহিদুল ইসলাম।
পর্তুগাল: সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সাবেক প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই মুহূর্তে সিঙ্গাপুর ও ইরান—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাসে রাষ্ট্রদূতের পদ খালি রয়েছে।
আদেশ অমান্য করে মালদ্বীপে রয়ে গেছেন নাজমুল ইসলাম
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া চার রাষ্ট্রদূত—এম মাহফুজুল হক (পর্তুগাল), মো. ময়নুল ইসলাম (পোল্যান্ড), এম মুশফিকুল ফজল আনসারী (মেক্সিকো) ও মো. নাজমুল ইসলামকে (মালদ্বীপ) মার্চের শুরুতে দেশে ফেরার নির্দেশ দিয়েছিল বিএনপি সরকার।
প্রথম তিনজন সরকারের আদেশ মেনে ঢাকায় ফিরলেও মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম এখনো দেশে ফেরেননি। তিনি সরকারের কাছে বিশেষ আবেদন জানিয়ে এখনো মালদ্বীপের কর্মস্থলেই অবস্থান করছেন, যা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে মৃদু গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।