৮ জুলাই, ২০২৬

মিশরের গোল বাতিল হলো, আর্জেন্টিনার গোল কেন বাতিল হলো না

মিশরের গোল বাতিল হলো, আর্জেন্টিনার গোল কেন বাতিল হলো না

বিশ্বকাপের নকআউটে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হেরে মিশরের বিদায়ের পর মাঠের ভেতরের উত্তেজনা এখন রূপ নিয়েছে টেবিলের আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে। মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসানের ‘মেসিকে বিশ্বকাপে টিকিয়ে রাখার অন্যায্য চেষ্টা’ কিংবা ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকোর রেফারিকে ‘জালিম’ আখ্যা দেওয়ার মতো বিস্ফোরক মন্তব্য ফুটবল বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আসলেই কি রেফারি পক্ষপাতিত্ব করেছিলেন, নাকি সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে নিয়ম মেনেই?

ক্রীড়াভিত্তিক প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ইএসপিএন’-এ ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে এক যুগেরও বেশি সময় রেফারিং ও ভিএআর (VAR) কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস এই ম্যাচের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি চুলচেরা ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। তাঁর সেই পেশাদার বিশ্লেষণের মূল অংশ ‘মুক্ত প্রভাত’-এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

১. ৬২ মিনিটে মিশরের গোলটি কেন বাতিল হলো?
কী ঘটেছিল: ম্যাচের ৬২তম মিনিটে মিশরের ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো এক দর্শনীয় গোল করে দলকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু ভিএআরের হস্তক্ষেপে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে মাঠের মনিটরে ভিডিও দেখে গোলটি বাতিল করেন। কারণ, আক্রমণটি তৈরি হওয়ার সময় মিশরের ডিফেন্ডার মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করেছিলেন।

ভিএআর ও ডেভিসের বিশ্লেষণ: ভিডিওতে পরিষ্কার দেখা যায়, আত্তিয়া একই সময়ে মার্তিনেজের জার্সি ধরে টেনেছেন এবং তাঁর পায়ের ওপর পা রেখে দিয়েছেন। এটি ফুটবলীয় নিয়মে স্পষ্ট ফাউল।

ডেভিসের রায়: গোল বাতিল সম্পূর্ণ সঠিক। অনেকের যুক্তি হতে পারে, ফাউলটি হয়েছিল বক্সের বেশ বাইরে মিশরের অর্ধে। কিন্তু নিয়ম হলো, একই আক্রমণপর্ব বা ‘সিকোয়েন্স’-এর সরাসরি পরিণতিতে যদি গোল হয়, তবে তার শুরুতে কোনো ফাউল থাকলে গোল বাতিল করতেই হবে। রেফারিকে যখন একসঙ্গে জার্সি টানা ও পায়ে পা রাখার অকাট্য প্রমাণ দেখানো হয়েছে, তখন গোল বহাল রাখার কোনো সুযোগই ছিল না।

২. আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে কেন ফাউল ধরা হলো না?
কী ঘটেছিল: যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ আর্জেন্টিনার হয়ে জয়সূচক গোলটি করার ঠিক আগমুহূর্তে মিশরের পেনাল্টি বক্সের ভেতর দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথমত, আর্জেন্টিনার আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার মিশরের হামদি ফাতির জার্সি টানেন এবং ফাতি মাটিতে পড়ে যান। দ্বিতীয়ত, মোহাম্মদ সালাহ দাবি করেন পেনাল্টি বক্সে ঢোকার সময় হুলিয়ান আলভারেস তাঁকে ফাউল করেছেন। কিন্তু রেফারি কোনোটিতেই বাঁশি বাজাননি এবং ভিএআরও মাঠের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

ভিএআর ও ডেভিসের বিশ্লেষণ: এটি ছিল ভিএআরের জন্য এক অবিশ্বাস্য মনস্তাত্ত্বিক ও জটিল পরিস্থিতি। কারণ এখানে সিদ্ধান্ত বদলালে এক প্রান্তে আর্জেন্টিনার গোল বাতিল হতো, অন্য প্রান্তে ঠিক আগের ঘটনার জন্য মিশর পেনাল্টি পেয়ে যেত।

ম্যাক আলিস্টারের ঘটনা: ম্যাক আলিস্টার ফাতির জার্সি ধরে কিছুটা ঝুঁকি নিয়েছিলেন সত্য, কিন্তু তা ছিল খুবই সামান্য সময়ের জন্য। এর ফলে ফাতির বল পাওয়ার সম্ভাবনা বা আক্রমণে কোনো প্রভাব পড়েনি। পেনাল্টি দেওয়ার মতো গুরুতর ফাউল এটি ছিল না।

সালাহর ঘটনা: আলভারেসের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ফাউল ছিল না। দুজনের গতির কারণে বুটে বুট লেগেছিল, যা ফুটবলে অত্যন্ত স্বাভাবিক। সালাহ এখানে ফাউলের চেয়ে রেফারিকে ধোঁকা দিয়ে পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টা বেশি করেছিলেন এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাটিতে পড়ে যান।

ডেভিসের রায়: রেফারি ও ভিএআরের সিদ্ধান্ত ১০০% সঠিক ছিল।

দুই ফাউলে ভিন্ন সিদ্ধান্ত কেন? (তুলনামূলক পার্থক্য)
মিশরীয় সমর্থকেরা দাবি করতে পারেন—আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ফাউলের শিকার হওয়াতে গোল বাতিল হলো, অথচ সালাহ বক্সে পড়ে যাওয়ার পরও পেনাল্টি দেওয়া হলো না কেন?

অ্যান্ডি ডেভিস এখানে স্পষ্ট রেখা টেনে দিয়েছেন। প্রথম ঘটনায় মিশরের আত্তিয়া স্পষ্টভাবে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারের পায়ের ওপর পাড়া দিয়েছিলেন (Stamping), যা ইচ্ছাকৃত এবং ক্ষতিকর। কিন্তু সালাহর ক্ষেত্রে সেটি ছিল স্রেফ রানিং পজিশনে দুজনের শরীরের স্বাভাবিক সংস্পর্শ (Normal Contact)। তাই দুটি ঘটনাকে এক পাল্লায় মাপার কোনো সুযোগ নেই।