প্যারাগুয়ের সেই শরীরসর্বস্ব ফুটবল স্রেফ ফ্রান্সের পরীক্ষাই নেয়নি, ফরাসি স্নায়ুর ওপর দিয়ে যেন বুলডোজার চালিয়েছে। কিলিয়ান এমবাপ্পের ওই পেনাল্টিটা যদি সেদিন জালে না জড়াত, তবে আজ হয়তো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে অন্য কোনো দলের গল্প লেখা হতো। কিন্তু ফুটবল তো আর ‘যদি’ কিংবা ‘কিন্তু’র সমীকরণে বাঁচে না। রক্তচাপ বাড়ানো সেই রাতের কঠিন বাধা পেরিয়ে ফ্রান্স এখন শেষ আটে।
আগামী ৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় বোস্টনের মাঠে সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ফরাসিদের মুখোমুখি হচ্ছে ফুটবলে আফ্রিকার নতুন সূর্য মরক্কো।
ফরাসি শিবিরে চোট আর কার্ডের হাহাকার
খাতায়-কলমে ম্যাচটি সেমিফাইনালে ওঠার হলেও, ফরাসি শিবিরের ফুরফুরে হাওয়ায় হঠাৎই যেন ভর করেছে বড় দুশ্চিন্তা। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে জয়টি ডাগআউটে চড়া মূল্য উসুল করে নিয়েছে। সহকারী কোচ গি স্টিফোঁর চোখে অবশ্য তরুণ দলটির মাথা ঠান্ডা রাখার ক্ষমতা মুগ্ধতা ছড়িয়েছে, তবে বোস্টনের মহালড়াইয়ের আগে কোচিং স্টাফদের কপালের চিন্তার ভাঁজ ঢাকার কোনো উপায় নেই।
মার্কোস থুরাম গত সোমবার অনুশীলনে ফেরায় ফরাসি শিবিরে ওটুকুই যা স্বস্তি। বাকিটা জুড়ে শুধুই ধোঁয়াশা। বিশেষ করে, অ্যাবডাক্টরের চোটে ভুগতে থাকা মাঝমাঠের চালিকাশক্তি অরেলিয়াঁ চুয়ামেনিকে এখনো চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে কাটাতে হচ্ছে। সহকারী কোচ স্টিফোঁর কণ্ঠেও সেই উদ্বেগ স্পষ্ট, "ওর চোটের উন্নতি দেখছি। তবে ম্যাচটি বৃহস্পতিবার, হাতে সময় বড্ড কম। ও অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে একা একা হালকা অনুশীলন করছে।"
চোটের পাশাপাশি কার্ডের খাঁড়াও ভাবাচ্ছে ফরাসিদের। প্যারাগুয়ে ম্যাচে তরুণ তুর্কি মাইকেল ওলিসের দেখা হলুদ কার্ডটি দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়েছে। ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন (এফএফএফ) অবশ্য এই কার্ডের বিরুদ্ধে ফিফার কাছে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
‘ফ্লুক’ নয়, মরক্কো এবার রূপকথার নতুন ট্রিলজি
অন্য ডাগআউটে থাকা মরক্কো যে এবার স্রেফ রূপকথা লিখতে আসেনি, তা আশরাফ হাকিমি ও ব্রাহিম দিয়াজরা মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই প্রমাণ করে দিয়েছেন। গ্রুপ পর্বে পরাশক্তি ব্রাজিলকে আটকে দেওয়া, আর নকআউটে নেদারল্যান্ডসের মতো দলকে বিদায় করা কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। বিশেষ করে, শেষ ম্যাচে সহ-আয়োজক কানাডাকে যেভাবে ৩-০ গোলে স্রেফ উড়িয়ে দিয়ে তারা কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে, তাতে ফরাসি থিঙ্কট্যাংক নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে।
মরক্কোর নিখুঁত পাসিং ফুটবল ও গতিশীল কাউন্টার অ্যাটাকের মিশ্রণকে সম্পূর্ণ ‘নতুন চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখছেন ফরাসি সহকারী কোচ স্টিফোঁ। মরক্কোকে সমীহ করে তিনি বলেন:
"ওরা অবিশ্বাস্য রকমের সুসংগঠিত, গোছাল এবং পাল্টা আক্রমণে দারুণ বিপজ্জনক। মাঠের সব পজিশনেই ওদের একক নৈপুণ্য দেখানোর মতো বিশ্বমানের ফুটবলার আছে।"
গতি বনাম কাউন্টারের মহালড়াই
বোস্টনের সবুজ মাঠে লড়াইটা আসলে দুই ভিন্ন ঘরানার। একদিকে আশরাফ হাকিমি আর ব্রাহিম দিয়াজদের নিখুঁত ও ক্ষিপ্র কাউন্টার অ্যাটাক, অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পেদের ইউরোপীয় ঘরানার গতিশীল ও আক্রমণাত্মক ফুটবল। পিএসজির দুই প্রাক্তন সতীর্থ ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু এমবাপ্পে-হাকিমির মুখোমুখি লড়াই এই ম্যাচের রোমাঞ্চ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।
শেষ আটের এই যুদ্ধ ফরাসিদের জন্য সেমির টিকিট এনে দেবে, নাকি বোস্টনের মাঠে আফ্রিকার মরক্কো তাদের রূপকথার নতুন কোনো ট্রিলজি লিখবে? উত্তর মিলবে আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পর।