দেশে পুনরায় নতুন করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চলছে বলে তীব্র ক্ষোভ ও অভিযোগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি। তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দেশের ছাত্র-জনতা এক দলের দুঃশাসনের পরিবর্তে অন্য কোনো দলের লুটপাট কিংবা চাঁদাবাজির লাইসেন্স দেওয়ার জন্য ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেনি।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেলে টাঙ্গাইলের সখীপুর পৌর শহরের তালতলা চত্বরে ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এক বিশাল পদযাত্রা ও পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণভোট বাস্তবায়ন, যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তীব্র বিদ্যুৎ সংকট নিরসন, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত সুরক্ষার দাবিতে এই দেশব্যাপী কর্মসূচির ডাক দেয় এনসিপি।
এই পদযাত্রায় নাহিদ ইসলামের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নেন দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
‘সংসদে কথা বলতে দেওয়া হয় না, জনসভায় মারা হয় বোমা’
বিগত সরকারের আমলের রাজনৈতিক নিপীড়নের কথা স্মরণ করে পথসভায় নাহিদ ইসলাম বলেন, "বিগত সময়ে দেশে একটি মাত্র দলের শাসন কায়েম ছিল। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ—কারও কথা বলার বিন্দুমাত্র স্বাধীনতা ছিল না; কথা বললেই গুম করে ফেলা হতো। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, বর্তমান সময়েও বাংলাদেশকে আবারো সেই একই রকম একদলীয় শাসনের দিকে ধাবিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।"
তিনি বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থার সমালোচনা করে আরও বলেন, "সংসদে আমাদের মন খুলে জনগণের কথা বলতে দেওয়া হয় না। আমরা যখন রাজপথে জনসভায় এসে সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলতে যাই, তখন আমাদের ওপর বোমা মারা হয়, ককটেল নিক্ষেপ করা হয়।"
আওয়ামী লীগের পরিণতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, "এই একদলীয় শাসন বা আধিপত্যবাদী রাজনীতি যদি দেশে কেউ নতুন করে আবার শুরু করতে চায়, তবে তাদের আমি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নির্মম পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। দীর্ঘ ষোলো বছর একদলীয় শাসন ও স্বৈরাচার চালিয়ে শেষ পর্যন্ত হেলিকপ্টার চড়ে আওয়ামী লীগকে দিল্লী পালাতে হয়েছে।"
সখীপুরের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ককটেল ফাটিয়ে, বোমা মেরে তারা মনে করেছিল আমাদের পদযাত্রা স্তব্ধ করে দেবে। কিন্তু সখীপুরের সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজ রাজপথে নেমে এসে তাদের সেই সব ষড়যন্ত্র ও কুপরিকল্পনা ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।"
মামলা বাণিজ্য ও নতুন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। বিচার ও আইনের শাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, "আমরা সবসময় দেশে সত্যিকারের ন্যায়বিচারের কথা বলেছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ৫ আগস্টের পর থেকে সারাদেশে এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল ঢালাওভাবে মামলা বাণিজ্য শুরু করেছে। নিরীহ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।"
তিনি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, "যারা মূল অপরাধী বা গত সরকারের অন্যায়-অত্যাচারের সাথে সরাসরি জড়িত, সেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবশ্যই সুষ্ঠু বিচার করেন। কিন্তু তাদের আড়ালে কোনো নিরীহ মানুষকে হয়রানি করতে দেওয়া হবে না। একই সাথে দেশে নতুন করে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি ও লুটপাট বরদাশত করা হবে না।"
"২০২৪ সালে আমাদের শত শত তরুণ ও ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছে দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য। যদি পরিবর্তনই না হয়, যদি মাদক সিন্ডিকেট থেকে যায়, যদি লুটপাট আর দুর্নীতি আগের মতোই অব্যাহত থাকে—তবে তরুণদের ঐ মহৎ আত্মত্যাগের কোনো মূল্য থাকে না।"
— নাহিদ ইসলাম এমপি, আহ্বায়ক, এনসিপি।
‘জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচিতে বিপুল জমায়েত
সখীপুরের তালতলা চত্বরে আয়োজিত এই পদযাত্রা ও পথসভাকে কেন্দ্র করে দুপুরের পর থেকেই স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং তরুণদের ঢল নামে। বিদ্যুৎ সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস ওঠা সাধারণ মানুষ ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে এনসিপির এই ‘জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করেন। দলটির নেতারা জানান, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি না মেলা পর্যন্ত রাজপথে তাদের এই আন্দোলন ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।