৭ জুলাই, ২০২৬

রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টি ও জোয়ারের যুগলবন্দি: কোমর পানিতে ডুবল চট্টগ্রাম, হাজার কোটির প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন

রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টি ও জোয়ারের যুগলবন্দি: কোমর পানিতে ডুবল চট্টগ্রাম, হাজার কোটির প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন

আষাঢ়ের চেনা রূপ পেরিয়ে এবার যেন রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে প্রকৃতি। টানা অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল আর কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের ত্রিমুখী প্রহারে আবারও পানির নিচে তলিয়ে গেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকেই নগরীর বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে সায়লাব হয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাট ছাড়িয়ে জোয়ার-বৃষ্টির নোংরা পানি ঢুকে পড়েছে মানুষের শোবার ঘর থেকে শুরু করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন, আর চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে রেকর্ড ৩৩০.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। একই সময়ে আমবাগান আবহাওয়া অফিসে ২৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

ড্রেনের মাটি ড্রেনেই, নির্মাণযজ্ঞে দুর্ভোগের নতুন মাত্রা
বরাবরের মতোই এবারও জলাবদ্ধতার তীব্র রূপ দেখা গেছে আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, পতেঙ্গা, কাতালগঞ্জ, হালিশহর, কাপাসগোলা, বহদ্দারহাট ও মুরাদপুরসহ নগরীর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। তবে এবারের জলজটের পেছনে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কাজের চরম অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগী নগরবাসী।

আগ্রাবাদের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "শেখ মুজিব রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ করার পর প্রধান সড়কের ওপর স্তূপ করে রাখা মাটিগুলো সরানো হয়নি। ফলে বৃষ্টির পানির স্রোতে সেই মাটি আবারও ড্রেনে ঢুকে পড়েছে। তার ওপর উড়ালসেতুর র‍্যাম্প নির্মাণের প্রতিবন্ধকতা, কাদামাটি ও জমাট পানিতে এক নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।"

একই চিত্র দেখা গেছে ইপিজেড এলাকার নিউমুরিং রোড, আকমল আলী রোড ও বন্দর টিলায়। অতি ভারী বৃষ্টির সাথে সাগরের জোয়ারের পানি যোগ হওয়ায় শত শত দোকানে পানি ঢুকে কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছে। আসবাবপত্র বাঁচাতে নাজেহাল হতে হয়েছে বাকলিয়ার গৃহিণী গুলশানের মতো হাজারো মানুষকে। গণপরিবহন ও সিএনজি অটোরিকশার তীব্র সংকটে অনেককে জুতো হাতে নিয়ে কোমর পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে ছুটতে দেখা গেছে।

"চট্টগ্রামে মাঝারি বৃষ্টি হলেও নগরের অধিকাংশ এলাকার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। চকবাজার, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট ও মুরাদপুর এলাকার অলিগলিতে দীর্ঘ সময় ধরে হাঁটু পানি জমে থাকে। এত প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হলো কই?"

— মাওলানা মহিউদ্দিন, ভুক্তভোগী পথচারী।

মাঠে চসিক, তবে কমেনি ক্ষোভ
জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত বছরগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও কেন সামান্য অতি ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম ডুবছে—তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডায় ক্ষোভ ঝাড়ছেন সাধারণ নাগরিক।

অবশ্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) জানিয়েছে, অতিবৃষ্টির সাথে সাগরের জোয়ারের পানি যুক্ত হওয়ায় পানি নেমে যেতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে বিভিন্ন খাল, নালা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক করতে চসিকের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

আরও ২-৩ দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস: পাহাড় ধসের শঙ্কা
চট্টগ্রামের এই জলযন্ত্রণা এখনই শেষ হচ্ছে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানিয়েছেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী দুই থেকে তিন দিন চট্টগ্রাম বিভাগে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে নিচু এলাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। একই সাথে পাহাড় ঘেরা এই অঞ্চলে পাহাড় ধসের তীব্র ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া অফিস। প্রশাসন থেকে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।