তাতিয়ে দেওয়ার ফল বুঝি এমনই হয়! মাঠের ফুটবলের চেয়ে মাঠের বাইরের ক্ষমতার জোর খাটাতে গিয়ে উল্টো বুমেরাং হলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর হাইভোল্টেজ ম্যাচে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছে বেলজিয়াম। তবে এই ম্যাচের আসল রোমাঞ্চ ছড়ালো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ফোন এবং ম্যাচ শেষে বেলজিয়াম শিবিরের রাজকীয় এক খোঁচায়!
এক ফোনেই আইন বদল, মাঠে ‘নিষ্ক্রিয়’ বালোগান
ঘটনার সূত্রপাত শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে। গ্রুপ পর্বে বসনিয়ার বিপক্ষে সরাসরি লাল কার্ড দেখায় এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার খাঁড়ায় পড়েছিলেন মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগান। নিয়ম অনুযায়ী বেলজিয়ামের বিপক্ষে তাঁর মাঠের বাইরে থাকার কথা ছিল।
কিন্তু আসরে স্বাগতিক দেশের সুবিধা নাকি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার দাপট? ঠিক ম্যাচের আগে ফিফা সভাপতিকে সরাসরি ফোন লাগান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্যস! এক ফোনেই যেন জাদু হলো। ফিফার নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্থগিত হয়ে গেল বালোগানের নিষেধাজ্ঞা। তিনি পেয়ে গেলেন বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলার সবুজ সংকেত।
ফিফা এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কথা অস্বীকার করলেও ট্রাম্প নিজে কিন্তু ঢাকঢোল পিটিয়ে এই ‘অর্জন’-এর কথা গর্ব ভরে প্রচার করেন। তবে ট্রাম্পের এই ‘পাওয়ার প্লে’ মাঠের পারফরম্যান্সে বিন্দুমাত্র কাজে আসেনি। পুরো ৯০ মিনিটে ম্যাচে বালোগান মাত্র ১৯ বার বল স্পর্শ করতে পেরেছেন, যা বেলজিয়াম ডিফেন্ডারদের সামনে ছিল বড্ড হাস্যকর।
তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল বেলজিয়াম
বিশ্বকাপের শুরু থেকে নিজেদের ছায়া হয়ে থাকা বেলজিয়াম যেন ট্রাম্পের এই কাণ্ড দেখেই খ্যাপাটে হয়ে ওঠে। গ্রুপ পর্বে মিসর ও ইরানের সাথে ড্রয়ের পর নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে কোনোমতে রাউন্ড অব ৩২-এ উঠেছিল তারা। সেখানেও সেনেগালের বিপক্ষে ঘাম ঝরানো জয়।
কিন্তু সিয়াটলে আজ ভোরের ম্যাচে দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য এক ‘রেড ডেভিলস’দের। দলের সেরা তারকা কেভিন ডি ব্রুইনাকে সাইডবেঞ্চে বসিয়ে রেখেও স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেয় বেলজিয়াম। ট্রাম্পের অন্যায় হস্তক্ষেপের জবাব তারা বুটের ডগা দিয়েই দেওয়ার পণ করেছিল যেন! একের পর এক আক্রমণে তছনছ করে দেয় মার্কিন রক্ষণভাগ।
লুকাকুর ‘ট্রাম্প ড্যান্স’ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রোল
ম্যাচের ব্যবধান যখন ৩-১, ঠিক ৯৩ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন বদলি নামা স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু। গোল করার পর লুকাকু ও পুরো বেলজিয়াম দল যা করল, তা ফুটবল ইতিহাস মনে রাখবে দীর্ঘদিন।
লুকাকু দুই হাত সামনে বাড়িয়ে ঠিক ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী সভার সেই বিখ্যাত নাচের ভঙ্গি নকল করা শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর সাথে যোগ দেয় পুরো দল। পুরো স্টেডিয়াম তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন ট্রোলে হাসিতে ফেটে পড়ে। ম্যাচের তুর্কি ধারাভাষ্যকারও রসিকতা করে বলে ওঠেন, ‘শেষ মিনিটে ট্রাম্প কোনো নিয়ম না পাল্টালে যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা এখানেই টাটা বলছি।’
“এটা বদলাও (Change This)!”
— ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (টুইটার)-এ ট্রাম্পকে খোঁচা দিয়ে রয়্যাল বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (আরবিএফএ) পোস্ট।
হাসির পাত্র ট্রাম্প
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই রয়্যাল বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাদের অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে সরাসরি তির ছোঁড়ে। ক্যাপশনে লেখে, ‘এটা বদলাও’। অর্থাৎ, ট্রাম্প ফোন করে লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারলেও, ৪-১ গোলের এই লজ্জাজনক হারের স্কোরলাইন বদলানোর সাধ্য তো আর প্রেসিডেন্টের নেই!
নিজের প্রিয় খেলোয়াড়কে নিয়মের বাইরে গিয়ে খেলাতে গিয়ে ট্রাম্প উল্টো নিজের দেশের ভরাডুবি ডেকে আনলেন এবং একই সাথে পুরো ফুটবল-বিশ্বের কাছে হাসির পাত্রে পরিণত হলেন।