৭ জুলাই, ২০২৬

জানাজায় লাখো মানুষের অশ্রু, অনুপস্থিত ‘মোজতবা’

জানাজায় লাখো মানুষের অশ্রু, অনুপস্থিত ‘মোজতবা’

লাখো মানুষের বাঁধভাঙা কান্না, বিশ্বনেতাদের ভিড় আর সাত দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকের আনুষ্ঠানিকতা—সব মিলিয়ে তেহরানের আকাশ-বাতাস এখন প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায়ের বেদনায় ভারী। কিন্তু এই বিশাল শোকযাত্রার মাঝেও তেহরানের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, সবার চোখ আটকে গেছে একটি জায়গায়। লাখো মানুষের উপস্থিতির চেয়েও এই মুহূর্তে বড় আলোচনা হয়ে দাঁড়িয়েছে একজনের অনুপস্থিতি। তিনি ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সেই একই হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে তাঁর পুত্র ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এমনকি নিজের পিতা ও স্ত্রীর জানাজাতেও তাঁর অনুপস্থিতি এখন ইরানিদের মনে জন্ম দিচ্ছে নানা প্রশ্ন আর গভীর এক নিরাপত্তা সংকটের অনুভূতি।

হত্যার হুমকি নাকি গুরুতর জখম?
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, মোজতবা খামেনির জীবনের ওপর এখনো তীব্র ‘হত্যাকারীদের হুমকি’ রয়েছে, যার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থেই তিনি আত্মগোপনে আছেন। কিন্তু পর্দার আড়ালের খবর অন্য কথা বলছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সেই বিমান হামলায় মোজতবা অত্যন্ত গুরুতর জখম হয়েছেন। তাঁর মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুই পায়েই বড় ধরনের আঘাত লেগেছে।

জানাজায় অংশ নেওয়া তেহরানের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী মাসুমেহ আল-জাজিরাকে বলেন, “আমার দেশ আর আগের সেই ইরান নেই। মোজতবার উপস্থিতি ছিল আমাদের নিরাপত্তার প্রতীক। এখন মনে হচ্ছে এই দেশে আর আগের মতো সেই নিরাপত্তা নেই।”

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভির মতে, ইরানের বিগত দুজন সর্বোচ্চ নেতাকে যেভাবে নিয়মিত দেখা যেত, সেই তুলনায় মোজতবার এই প্রকাশ্য অনুপস্থিতি নিশ্চিতভাবেই অস্বাভাবিক। তবে তাঁর ওপর যে বাস্তব জীবননাশের হুমকি রয়েছে, তাতে এই অন্তরালকে পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা বলেই মনে করছেন তিনি।

ইসরায়েলের সরাসরি হুমকি ও শীর্ষ নেতৃত্বে ধস
সোমবার যখন খামেনির মরদেহবাহী কফিন তেহরানের সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করছিল, ঠিক তখনই হিব্রু ভাষায় দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ মোজতবা খামেনিকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বসেন। কাৎজ সাফ বলেন, “খুনিকে খুন করা হয়েছে। অন্য কোনো ইরানি নেতা আবার ইসরায়েলকে ধ্বংসের পরিকল্পনা করলে, তাঁকেও একইভাবে প্রতিহত করা হবে।” গত সপ্তাহেই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, মোজতবা খামেনি এখন ইসরায়েলের ‘হিট লিস্টে’র শীর্ষে আছেন।

আসলে, ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই হামলার পর থেকে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর দিয়ে এক বিশাল ঝড় বয়ে গেছে। আয়াতুল্লাহ খামেনির পাশাপাশি তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনী প্রধান, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার এবং পারমাণবিক ও গোয়েন্দা বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বড় অংশকে হয় হত্যা করা হয়েছে, নয়তো তারা গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন।

ছায়া সরকার ও চক্রান্তের গুঞ্জন
নেতার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি ইরানের সাধারণ জনগণের একটি অংশের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও সরকারের প্রতি অনাস্থার জন্ম দিয়েছে। তেহরানের ৪৭ বছর বয়সী বাসিন্দা সোমায়েহর মতে, সরকার বড় বড় কথা বললেও মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য সর্বোচ্চ নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, যা অত্যন্ত রহস্যজনক।

অনেকে আশঙ্কা করছেন, সরকারের ভেতরের কোনো গোষ্ঠী হয়তো সর্বোচ্চ নেতার এই আড়ালের সুযোগ নিয়ে নেতার নামে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে এবং জনগণের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে।

মুক্ত প্রভাত মন্তব্য: আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ইরান এখন তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। একদিকে ইসরায়েলের একের পর এক নিখুঁত হামলা ও প্রকাশ্য হুমকি, অন্যদিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতার গুরুতর অসুস্থতা ও অন্তরাল—তেহরানের ক্ষমতা কাঠামোকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। শত্রুপক্ষ যেখানে সাবেক নেতার প্রতি কোনো দয়া দেখায়নি, সেখানে নতুন নেতার সুরক্ষাই এখন ইরানি প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এই কুয়াশাচ্ছন্ন পরিস্থিতি যত দীর্ঘ হবে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফাটল ততটাই চওড়া হবে।