৭ জুলাই, ২০২৬

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু দ্বন্দ্বে খাদের কিনারায় ওয়াশিংটন-তেল আবিব সম্পর্ক

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু দ্বন্দ্বে খাদের কিনারায় ওয়াশিংটন-তেল আবিব সম্পর্ক

১৯৪৮ সালে জায়নবাদী মিলিশিয়া বাহিনী থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গড়ে ওঠার পর থেকে যে রাষ্ট্রটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে ওয়াশিংটন, সেই অভেদ দেওয়ালই এখন ভাঙনের মুখে। বৈশ্বিক কূটনীতির পর্দার আড়ালে চলা দীর্ঘদিনের গুঞ্জন এখন বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের এক চরম পুনর্মূল্যায়ন এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার।

একদিকে চার দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও নিজের অস্তিত্ব টেকাতে মরিয়া বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামিয়ে বড় কোনো কূটনৈতিক সাফল্যের খোঁজে থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্প—এই দুই রাষ্ট্রনায়কের ব্যক্তিগত অহম ও স্বার্থের সংঘাত এখন ওয়াশিংটন-তেল আবিবের ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বকে এক নজিরবিহীন টানাপোড়েনের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

‘সবাই আপনাকে ঘৃণা করে’: ফাঁস হওয়া ফোনে ট্রাম্পের ক্ষোভ
সম্প্রতি হোয়াইট হাউজ থেকে ফাঁস হওয়া একটি ফোন কল দুই নেতার সম্পর্কের তিক্ততাকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে, যা অস্বীকার করেনি মার্কিন প্রশাসনও। ইরানের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি করতে মরিয়া ট্রাম্প যখন লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধের শর্ত মেনে নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছিলেন, তখন নেতানিয়াহু তাতে অস্বীকৃতি জানান। আর এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে কড়া ভাষায় তিরস্কার করে সরাসরি ‘উন্মাদ’ বলে অভিহিত করেন।

সূত্রের খবর, ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে নেতানিয়াহুকে বলেন, মার্কিন হস্তক্ষেপ না থাকলে তিনি এতদিনে দুর্নীতি মামলায় জেলেই থাকতেন। ট্রাম্প সরাসরি বলেন, ‘সবাই এখন আপনাকে ঘৃণা করে। আপনার কারণে সবাই ইসরায়েলকে ঘৃণা করছে।’ এর রেশ ধরে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও ট্রাম্পের দম্ভোক্তি ছিল স্পষ্ট—‘নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন যে আসল বস কে।’

এমনকি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইসরায়েলি মন্ত্রীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ইসরায়েলকে রক্ষাকারী প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের দুই-তৃতীয়াংশই মার্কিন করদাতাদের অর্থে কেনা।

‘মাগা’ শিবিরে ফাটল ও মার্কিন জনমতের বদল
ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পটপরিবর্তন। কেবল সাধারণ মার্কিন জনগণই নয়, ট্রাম্পের কট্টর ডানপন্থী সমর্থক ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (MAGA) আন্দোলনের অন্দরেও এখন ইসরায়েলকে নিয়ে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।

মাগা শিবিরের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মার্জোরি টেইলর গ্রিন কিংবা জনপ্রিয় সাবেক টিভি উপস্থাপক টাকার কার্লসন এখন ইসরায়েলের প্রতি শর্তহীন মার্কিন সমর্থনের সবচেয়ে বড় সমালোচক। কার্লসন সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, ইসরায়েল আসলে ট্রাম্পকে ‘প্ররোচিত ও হুমকি’ দিয়ে ইরানে হামলা করতে রাজি করাতে চেয়েছিল, যাতে সেই উসিলায় লেবাননে আরেকটি যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া যায়।

ওয়াশিংটনের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড্যানিয়েল বাইম্যানের মতে, ট্রাম্পের হাতে এখন ইসরায়েল নীতি বদলানোর যথেষ্ট নমনীয়তা রয়েছে। কারণ ডেমোক্র্যাটদের বড় অংশ এমনিতেই ইসরায়েলের সমালোচক, আর রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশকে ট্রাম্প নিজের একক ক্যারিশমায় যেকোনো সিদ্ধান্তের পক্ষে আনতে পারেন।

তেল আবিবে ভয়ের হাওয়া: কাঠগড়ায় নেতানিয়াহু
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তার ওপর ইসরায়েল কতটা নির্ভরশীল, তা গাজা ও লেবানন যুদ্ধেই প্রমাণিত। ২০১৬ সাল থেকে ১০ বছর মেয়াদে ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের রেকর্ড সামরিক সহায়তা ছাড়াও গাজায় নির্বিচার হামলায় ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পরও জাতিসংঘে অন্তত ছয়বার ভেটো দিয়ে ইসরায়েলকে বাঁচিয়েছে ওয়াশিংটন।

আজ সেই পরম মিত্রের সঙ্গে দূরত্বের কারণে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর আসন নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে তাঁর হারের সম্ভাবনা প্রবল। সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এক্স-এ (টুইটার) লিখেছেন, ‘আমরা দ্রুত এই সরকারকে পরিবর্তন না করলে ইসরায়েলের বৈদেশিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।’ নেতানিয়াহুর প্রধান নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটও তোপ দেগে বলেছেন, নেতানিয়াহুর ব্যর্থতাই ট্রাম্পকে একাকী ইরানের সঙ্গে চুক্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

মুক্ত প্রভাত মন্তব্য: দীর্ঘদিনের মিত্র হলেও ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার এই ফাটল রাতারাতি সম্পর্ক ছিন্ন করবে না ঠিকই, তবে ইসরায়েলের ‘শর্তহীন অভিভাবক’ হিসেবে ওয়াশিংটনের যে ভূমিকা ছিল, তা যে চিরতরে বদলে যাচ্ছে—সেই বার্তা স্পষ্ট। ইতিহাসের অন্যতম নৃশংসতম সামরিক অভিযান চালিয়ে বিশ্বজুড়ে একঘরে হওয়া ইসরায়েল যদি তার শেষ আশ্রয়স্থল ওয়াশিংটনকেও ক্ষুব্ধ করে তোলে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে তেল আবিবের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে বাধ্য।