৭ জুলাই, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফিফাকেও হারাল বেলজিয়াম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফিফাকেও হারাল বেলজিয়াম

মাঠের বাইরের টেবিলে তখন ফুটবলের চিরন্তন নীতি আর নৈতিকতার পরাজয় ঘটেছে। খোদ বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ‘ফিফা’ নতি স্বীকার করেছে রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে। কিন্তু সবুজ ঘাসের মাঠে যখন বল গড়াল, তখন সমস্ত অন্যায্যতার জবাব বুটের নিখুঁত টোকায় আর কৌশলের মহিমায় ফিরিয়ে দিল বেলজিয়াম। সিয়াটলে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪–১ গোলের বিশাল ব্যবধানে চূর্ণ করে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছে রেড ডেভিলরা। যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ইউরোপীয় জায়ান্ট স্পেন।

তবে এই ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে খেলার ফলাফলের জন্য নয়, বরং মাঠের বাইরের এক নজিরবিহীন কলঙ্কজনক অধ্যায়ের জন্য।

হোয়াইট হাউজের ফোন ও ফিফার নতি স্বীকার
বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগান। শেষ বত্রিশের ম্যাচে বসনিয়ার বিপক্ষে সরাসরি লাল কার্ড দেখেছিলেন তিনি। ফুটবলীয় নিয়ম অনুযায়ী, ন্যূনতম এক ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে খেলা, তাই স্বাগতিকদের সেরা তারকাকে মাঠে রাখতে পর্দার আড়ালে নড়েচড়ে বসে ক্ষমতার করিডোর। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ফোন কলের পর ফিফা অবিশ্বাস্যভাবে বালোগানের শাস্তি স্থগিত করে দেয়!

ফুটবল ইতিহাসে লাল কার্ড পেয়েও পরের ম্যাচেই কোনো ফুটবলারের মাঠে নেমে যাওয়ার এমন নজিরবিহীন ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। ফিফার এই অনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে আপিল করেছিল বেলজিয়াম। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্তা সংস্থা বেলজিয়ামকে ‘ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়’ বলে অদ্ভুত এক অজুহাতে সেই আপিল খারিজ করে দেয়।

মাঠে বালোগান: বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো
ফিফার আদালতে বেলজিয়াম হারলেও, মাঠের নিয়ন্ত্রণ ছিল বেলজিয়ান ডিফেন্ডারদের পায়ে। যে বালোগানকে খেলানোর জন্য এত আয়োজন, পুরো ৯০ মিনিটে সিয়াটলের মাঠে তিনি ছিলেন স্রেফ একজন দর্শক। বেলজিয়ামের রক্ষণভাগের কড়া পাহারায় পুরো ম্যাচে মাত্র ১৯ বার বল স্পর্শ করতে পেরেছেন এই মার্কিন ফরোয়ার্ড। আগের চার ম্যাচে তিন গোল করা বালোগানকে এদিন মাঠেই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

গোলবন্যা ও মার্কিন রক্ষণের ভরাডুবি
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে বেলজিয়াম। গোল পেতেও দেরি হয়নি তাদের।

৯ম মিনিট (১-০): নিকোলাস রাসকিনের চমৎকার পাস থেকে নিখুঁত টোকায় বল জালে জড়ান বেলজিয়ান তারকা চার্লস ডি কেটেলারা।

৩১তম মিনিট (১-১): ম্যাচের ধারার বিপরীতে সমতায় ফেরে যুক্তরাষ্ট্র। মালিক টিলম্যানের নেওয়া ফ্রি-কিক বেলজিয়ান মিডফিল্ডার হান্স ফানাকানের মাথায় লেগে দিক পরিবর্তন করে আত্মঘাতী গোল হলে উল্লাসে মাতে স্বাগতিক দর্শকরা।

৩৩তম মিনিট (২-১): যুক্তরাষ্ট্রের সেই আনন্দ স্থায়ী হয়েছে মাত্র ১২০ সেকেন্ড। লিয়ান্দ্রো ত্রোসারের মাপা ক্রস থেকে দর্শনীয় হেডে নিজের দ্বিতীয় গোল করে বেলজিয়ামকে পুনরায় লিড এনে দেন কেটেলারা।

দ্বিতীয়ার্ধে মার্কিন গোলরক্ষকের উপহার
১-২ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু করা যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচে ফেরার লড়াই করছিল। কিন্তু ৫৭ মিনিটে সব ভেস্তে যায় মার্কিন গোলকিপার ম্যাট ফ্রিজের এক মারাত্মক ভুলে। বক্সের বাইরে এসে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন তিনি। চতুর কেটেলারা বল কেড়ে নিয়ে পাস দেন হান্স ফানাকানকে। প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে ফাঁকা পোস্টে ঠান্ডা মাথায় শট নিয়ে ব্যবধান ৩-১ করেন ফানাকান।

লুকাকুর শেষ পেরেক
ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে, যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে (৯৩ মিনিট) যুক্তরাষ্ট্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকেন অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু। এবার মার্কিন ডিফেন্ডার ক্রিস রিচার্ডসের ভুল পাস থেকে বল কেড়ে নিয়ে লুকাকুকে বাড়িয়ে দেন ম্যাচের নায়ক ফানাকান। বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কোনাকুনি জোরালো শটে জাল কাঁপান লুকাকু (৪-১)।

মুক্ত প্রভাত মন্তব্য: সিয়াটলের রাতটি আসলে ক্ষমতার দাপট বনাম ফুটবলের সৌন্দর্যের লড়াই ছিল। ফিফার আদালতকে হয়তো ট্রাম্পের ফোন কল প্রভাবিত করতে পেরেছে, কিন্তু বেলজিয়ামের আক্রমণভাগের ধারালো ফুটবলকে রুখতে পারেনি। মাঠের খেলায় যুক্তরাষ্ট্রকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে বেলজিয়াম প্রমাণ করল—ফুটবল শেষ পর্যন্ত মাঠেরই খেলা, আদালতের নয়। আগামী শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় স্পেনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে নামবে বেলজিয়াম।