১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং ২০০২—ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তবে ২০০২ সালে ‘পেন্টা’ জয়ের পর থেকেই যেন এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে সেলেসাওরা। ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ায় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের খরা আরও দীর্ঘায়িত হলো। আসরসংখ্যার হিসাবে (৬টি আসর) এটিই এখন ব্রাজিলের ইতিহাসের দীর্ঘতম খরা। আর বছর হিসেবে ২০৩০ বিশ্বকাপ আসতে আসতে এই অপেক্ষা ছোঁবে ২৮ বছর, যা তাদের যৌথভাবে দীর্ঘতম অপেক্ষার রেকর্ড।
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে অংশ নেওয়া একমাত্র দলটির ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ ট্রফি জয়ের মিশন গত দুই দশকে যেভাবে বারবার চূর্ণ হয়েছে, একনজরে দেখে নেওয়া যাক সেই স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস:
২০০৬ বিশ্বকাপ: জিদান জাদুতে স্তব্ধ সেলেসাওরা (কোয়ার্টার ফাইনাল)
রোনালদো, কাফু, রবার্তো কার্লোসদের নিয়ে গড়া তারকাখচিত দল নিয়ে সেবার জার্মানি গিয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু ফ্রাঙ্কফুর্টের কোয়ার্টার ফাইনালে ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের অবিস্মরণীয় জাদুর কাছে হার মানতে হয় কার্লোস আলবার্তো পাহেইরার দলকে। জিদানের নিখুঁত সেট পিস থেকে থিঁয়েরি অঁরির করা একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।
২০১০ বিশ্বকাপ: স্নাইডারের জোড়া আঘাতে ডাচদের জয় (কোয়ার্টার ফাইনাল)
খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপজয়ী কার্লোস দুঙ্গার অধীনে কাকা, রবিনিও, দানি আলভেজদের নিয়ে গড়া ব্রাজিল দল ছিল বেশ ভারসাম্যপূর্ণ। পোর্ট এলিজাবেথে কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ১০ মিনিটে রবিনিওর গোলে এগিয়েও যায় ব্রাজিল। তবে বিরতির পর ডাচ তারকা ওয়েসলি স্নাইডারের জোড়া গোলে (৫৩ ও ৬৮ মিনিটে) ২-১ ব্যবধানে হেরে স্তব্ধ হয়ে যায় সেলেসাও সমর্থকেরা।
২০১৪ বিশ্বকাপ: ঘরের মাঠে ‘মিনেইরাজ্জো’ বিপর্যয় (সেমিফাইনাল)
ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ হওয়ায় ‘হেক্সা’ জয়ের আশায় বুঁদ ছিল পুরো ব্রাজিল। কিন্তু বেলো হরাইজন্তেতে জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক ও লজ্জাজনক হারে মুখ থুবড়ে পড়ে লুই ফেলিপে স্কলারির দল। চোটের কারণে পোস্টার বয় নেইমার এই ম্যাচে খেলতে পারেননি। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে এই ম্যাচটি ‘মিনেইরাজ্জো’ নামের এক দুঃসহ কালো অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।
২০১৮ বিশ্বকাপ: বেলজিয়ামের ‘সোনালী প্রজন্ম’-এর কাছে হার (কোয়ার্টার ফাইনাল)
নেইমার, ফিলিপ কুতিনিও, মার্সেলো ও কাসেমিরোদের ওপর ভর করে রাশিয়ায় আবারও স্বপ্ন বুনতে শুরু করে ব্রাজিল। তবে কাজানে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলের সামনে পরাস্ত হয় তারা। ফার্নান্দিনিওর আত্মঘাতী গোল ও কেভিন ডি ব্রুইনার দারুণ গোলে ২-১ ব্যবধানে জেতে বেলজিয়াম। ব্রাজিলের হয়ে রেনাতো অগাস্তো এক গোল শোধ করলেও তা বিদায় এড়াতে যথেষ্ট ছিল না।
২০২২ বিশ্বকাপ: ক্রোয়াটদের টাইব্রেকার ভাগ্য (কোয়ার্টার ফাইনাল)
কাতারের আল রাইয়ানে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল চরম নাটকীয়তায়। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে (১০৫+১ মিনিটে) নেইমারের জাদুকরী গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু ১১৭ মিনিটে ব্রুনো পেতকোভিচের গোলে সমতায় ফেরে ক্রোয়েশিয়া। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে হেরে চোখের জলে কাতার ছাড়ে নেইমার-মার্কিনিওসরা।
২০২৬ বিশ্বকাপ: হলান্ড ঝড়ে শেষ ষোলোতেই বিদায় (শেষ ষোলো)
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে এবার ব্রাজিলের স্বপ্ন ভাঙার নায়ক নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে হলান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানের ঐতিহাসিক জয় পায় নরওয়ে। ম্যাচের প্রথমার্ধে ব্রুনো গিমারাইস পেনাল্টি মিস করে সুযোগ হাতছাড়া করেন। একদম শেষ সময়ে পেনাল্টি থেকে নেইমার একটি গোল শোধ করলেও তা কেবলই সান্ত্বনা বাড়িয়েছে। ম্যাচ শেষে কাঁদতে কাঁদতে নেইমারের মাঠ ছাড়ার দৃশ্যই যেন ফুটিয়ে তুলেছে ব্রাজিলের দীর্ঘায়িত এই হেক্সা-হতাশাকে।