কাগজে-কলমে লড়াইটা ছিল এক অসম যুদ্ধ। একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে আটলান্টিক মহাসাগরের বুক থেকে উঠে এসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার টিকিট পাওয়া পুঁচকে কেপ ভার্দে। নকআউট পর্বের এই ম্যাচটিকে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন স্রেফ আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে যা ঘটল, তা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় রূপকথা হয়ে থাকবে বহুদিন। ১২০ মিনিটের এক রুদ্ধশ্বাস ও স্নায়ুক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে কেপ ভার্দেকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে লিওনেল মেসির দল।
আর্জেন্টিনা জিতলেও ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করে নিয়েছে লড়াকু কেপ ভার্দে। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টাইন শিবিরে যে বুনো উদ্যাপন দেখা গেল, তাতেই স্পষ্ট বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের কতটা তটস্থ করে রেখেছিল আফ্রিকার এই চুনোপুঁটিরা।
মেসির রেকর্ড ও ভোজিনিয়ার দেওয়াল
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজায় আর্জেন্টিনা। যার ফলশ্রুতিতে ২৯তম মিনিটে আসে প্রথম সাফল্য। লিসান্দ্রো মার্তিনেসের বাড়ানো লম্বা পাস চমৎকার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গোলকিপার ভোজিনিয়ার মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়ান অধিনায়ক লিওনেল মেসি। এটি চলতি বিশ্বকাপে মেসির সপ্তম এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ২০তম গোল। একই সাথে টানা আটটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার অনন্য এক কীর্তিও গড়েন এলএমটেন।
তবে এই গোলের পরই শুরু হয় আফ্রিকান দলটির রূপকথার প্রতিরোধ। বিশেষ করে কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া ম্যাচের বাকি সময়ে আর্জেন্টিনার সামনে এক দুর্ভেদ্য দেওয়াল হয়ে দাঁড়ান। প্রথমার্ধের শেষদিকে এনজো ফার্নান্দেজের নিশ্চিত গোলের সুযোগ নসাৎ করে দলকে ম্যাচে রাখেন তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধে কেপ ভার্দের পাল্টা আঘাত
বিরতি থেকে ফিরে রূপ বদলে মাঠে নামে কেপ ভার্দে। একের পর এক আক্রমণে কাঁপিয়ে দেয় আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ। ৫৪ মিনিটে দেরয় দুয়ার্তের একটি জোরালো শট এমি মার্তিনেজ ফিরিয়ে দিলেও, ৫৯ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি। রায়ান মেন্দেসের নিখুঁত কাটব্যাক থেকে এক দুরূহ কোণ থেকে লক্ষ্যভেদ করে কেপ ভার্দেকে ১-১ সমতায় ফেরান সেই দুয়ার্তেই।
গোল হজম করে মরিয়া হয়ে ওঠেন আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি। মাঠে নামানো হয় হুলিয়ান আলভারেজ, নিকোলাস গনসালেসদের। ম্যাচের ৬২ ও ৭২ মিনিটে মেসির দুটি দুর্দান্ত প্রচেষ্টা এবং শেষদিকে পারেদেসের দূরপাল্লার শট রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দেন বুড়ো ভোজিনিয়া। ফলে ৯০ মিনিটের খেলা শেষ হয় ১-১ সমতায়।
অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তা
অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরু হতেই (৯২ মিনিট) কর্নার থেকে ম্যাক আলিস্টারের ফ্লিকে বল পেয়ে বাঁ পায়ের চমৎকার শটে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন লিসান্দ্রো মার্তিনেস। কিন্তু কেপ ভার্দে যে সহজে হার মানার পাত্র নয়! ১০৩ মিনিটে মাঠের বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের এক জাদুকরী বাঁকানো শটে গোল করেন সিডনি কাবরাল। টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা এই গোলের বিপরীতে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না আর্জেন্টাইন বাজপাখি এমি মার্তিনেজের।
ভাগ্যের ছোঁয়ায় জয়, ট্র্যাজিক হিরো কেপ ভার্দে
ম্যাচ যখন ধীরে ধীরে টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ১১১তম মিনিটে আসে সেই ‘নিষ্ঠুর’ মুহূর্ত। মেসির বাঁকানো কর্নার থেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর জোরালো হেড কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার বোর্জেসের হাতে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ায়। এই আত্মঘাতী গোলেই স্বপ্নভঙ্গ হয় আফ্রিকার দলটির।
শেষ মুহূর্তেও লড়াই ছাড়েনি কেপ ভার্দে। ১১৬ মিনিটে কাবরালের ফ্রি-কিক এবং ১১৯ মিনিটে গিলসনের শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।
৩-২ গোলের এই জয়ে আর্জেন্টিনা আগামী ৭ জুলাই শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরের মুখোমুখি হবে। তবে স্কোরলাইন আর্জেন্টিনার পক্ষে কথা বললেও, এই ম্যাচটি চিরকাল মনে রাখা হবে কেপ ভার্দের অসমসাহসী বীরত্বের জন্য। স্পেন ও উরুগুয়ের পর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকেও যেভাবে তারা খাদের কিনারে নিয়ে গিয়েছিল, তা বিশ্বফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে দাগ কেটে থাকবে বহুদিন।