নাটোরের সিংড়া উপজেলার রামানন্দ খাজুরা ইউনিয়নের বেলতা গ্রামে সরকারি খাস পুকুর দখলকে কেন্দ্র করে সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর মিথ্যা মামলা ও পুলিশি হয়রানির তীব্র অভিযোগ উঠেছে। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে এবং ফাঁদে ফেলতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিজেরাই নিজেদের ক্লাব ঘর ভাঙচুর করে মিথ্যা নাটকের অবতারণা করেছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সিংড়া-বেলতা এলাকার স্থানীয় একটি স্কুলের পাশে আয়োজিত এক বিশাল মানববন্ধনে শতাধিক নারী, পুরুষ ও কিশোর একত্রিত হয়ে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সৌরভ হোসেন ও তামিম হোসেনসহ প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানায়, গ্রামে ‘চার দিগন্ত’ নামে একটি ক্লাব গড়ে তুলেছে স্থানীয় কিছু যুবক। গত ১ জুলাই সকাল ৯টার দিকে ওই ক্লাবের সদস্যরা গ্রামের দুটি খাস পুকুরে অতর্কিতে লাল পতাকা টাঙিয়ে জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করে। বিষয়টি দেখে গ্রামের সাধারণ মানুষ পুকুর থেকে লাল পতাকাগুলো খুলে সসম্মানে ওই ক্লাবের আঙিনায় রেখে আসেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গ্রামবাসী চলে আসার পর ক্লাবের ভেতরের আসবাবপত্র এবং দেওয়ালে থাকা প্রধানমন্ত্রীর ছবি ক্লাবের লোকেরাই নিজেরা ভাঙচুর করে। পরে গ্রামবাসীর ওপর দায় চাপাতে বিকেলে সিংড়া থানায় গিয়ে ক্লাব ভাঙচুরের এক কাল্পনিক অভিযোগ দায়ের করেন আনোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের টাকা বনাম জুয়ার আখড়া
গ্রামের প্রধান প্রবীণ ব্যক্তিত্ব জমসেদ আলী জানান, বিগত ১০ বছর ধরে এই দুটি খাস পুকুর নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। এই দীর্ঘ সময়ে স্থানীয়রা বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, পুকুর দুটি থেকে প্রাপ্ত আয় গ্রামের মসজিদ, মাদ্রাসা ও কবরস্থানের উন্নয়নকল্পে ব্যয় করা হবে। সেই সিদ্ধান্তের আলোকেই সম্প্রতি কবরস্থানের মাটি ভরাটসহ মসজিদের উন্নয়নকাজের প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু হুট করে একটি বিশেষ মহল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এই অর্থ হাতিয়ে নিতে মাঠ গরম করার চেষ্টা করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হিরা বেগম, মিলন আলী মন্ডল ও জয়নাব খাতুনের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁরা জানান, বেলতা গ্রামের আনোয়ার, সাকিব, রেজা ও অনিকসহ স্থানীয় কতিপয় বিএনপি নেতাকর্মীর ছত্রছায়ায় ওই ক্লাবে দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার আসরসহ নানা অপকর্ম চলছে। তারা গ্রামবাসীর কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল এবং একটি পুকুর ক্লাবের নামে লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। গ্রামের মানুষ সেই অনৈতিক দাবি মেনে না নেওয়াতেই এই আক্রোশ।
মধ্যরাতে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, আতঙ্কে গ্রামবাসী
অভিযোগের পর কোনো প্রকার নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়াই ওই দিন রাতেই সিংড়া থানার ২০-২৫ জনের একটি পুলিশ দল বেলতা গ্রামে প্রবেশ করে। তারা গভীর রাতে একের পর এক সাধারণ মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাঁড়াশি তল্লাশি চালায়। পুলিশের এই আকস্মিক হানায় পুরো গ্রামে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে ঘুমন্ত নারী ও শিশুদের মধ্যে গভীর মানসিক ভীতির সৃষ্টি হয়। কোনো প্রমাণ ছাড়া পুলিশের এমন অতি-উৎসাহী ভূমিকায় হতবাক ও ক্ষুব্ধ পুরো বেলতা গ্রাম।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মামলার বাদী আনোয়ার হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, "আমি ফোনে কোনো বক্তব্য দেব না। সরাসরি এসে বক্তব্য নাও, এভাবে সাংবাদিকদের কাছে মুখ খুলতে আমি রাজি নই। থানায় মামলা করেছি, যা বলার আর্জিতেই বলেছি।"
সিংড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, "এই বিষয়ে থানায় আনোয়ার নামের এক ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করেছেন। সেই মামলার প্রেক্ষিতেই পুলিশ রাতে আইনগত পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ওই এলাকায় গিয়েছিল।"
মুক্ত প্রভাত বিশ্লেষণ: গ্রামীণ জনপদে খাস জমি বা পুকুর দখল করতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ‘গায়েবি ভাঙচুর’ করে মামলা দেওয়ার সংস্কৃতি নতুন নয়। তবে কোনো প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই গভীর রাতে পুরো গ্রামে পুলিশের এমন সাঁড়াশি অভিযান সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত কোনো দলের অন্ধ হাতিয়ার না হয়ে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করা।