৩ জুলাই, ২০২৬

খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে বিশ্বনেতাদের ঢল

খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে বিশ্বনেতাদের ঢল

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক ও দাফন প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা আজ শুক্রবার থেকে তেহরানে শুরু হয়েছে। আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এই বিদায় অনুষ্ঠানে বিশ্বের শতাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এই ঐতিহাসিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে বর্তমানে তেহরানে অবস্থান করছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের মুখে ৮৬ বছর বয়সী খামেনি নিহত হন। যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতার কারণে মার্চ মাসের নির্ধারিত দাফন সূচি পিছিয়ে আজ থেকে সাত দিনব্যাপী এই শোক উৎসবের সূচনা হলো। তবে ইসরায়েলি গুপ্তহত্যার হুমকির মুখে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সতর্কতার অংশ হিসেবে খামেনির উত্তরসূরি ও তাঁর পুত্র মোজতবা আলী খামেনি এই অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থাকছেন না বলে নিশ্চিত করেছে কূটনৈতিক সূত্র।

সাত দিনের শোকযাত্রা: তেহরান থেকে মাশহাদ
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, আজ শুক্রবার তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শনি ও রোববার সেখানে খামেনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কফিন রাখা হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন।

পরবর্তীতে সোম ও মঙ্গলবার শোকযাত্রাটি পবিত্র নগরী কোমের দিকে এগোবে। বুধবার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ইরাকের নাজাফ ও কারবালা শহরে। সবশেষে আগামী শুক্রবার (১০ জুলাই) খামেনির জন্মস্থান—ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মাশহাদ শহরের ইমাম রেজার মাজারে তাঁর চূড়ান্ত দাফন সম্পন্ন হবে। আয়োজকদের ধারণা, ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির দাফনে অংশ নেওয়া এক কোটি মানুষের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে এই শেষযাত্রা।

বিশ্বমঞ্চের উপস্থিতি ও নেপথ্যের কূটনৈতিক সমীকরণ
খামেনির এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানটি একই সাথে বিশ্বরাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন শান্তি প্রক্রিয়ার এক বড় মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

পাকিস্তান: মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নিজে এই অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। পাকিস্তানের দূতিয়ালিতেই এপ্রিল মাসে সাময়িক যুদ্ধবিরতি এবং গত ১৭ জুন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়।

রাশিয়া ও চীন: ক্রেমলিনের পক্ষে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ এবং বেইজিংয়ের পক্ষে জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির সহসভাপতি হে ওয়েই তেহরানে পৌঁছেছেন।

ভারত: ভারতের সরকারি পদে থাকা সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ শিয়া ব্যক্তিত্ব ও সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল তথা বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন দেশটির প্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রতিনিধিদলে আরও আছেন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারিটা ও বিরোধী নেত্রী মেহবুবা মুফতি।

আফগানিস্তান ও তুরস্ক: তালেবান সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী আব্দুল গনি বারাদার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি এবং তুরস্কের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ এই দাফন প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন। এছাড়াও তাজিকিস্তান, আর্মেনিয়া ও জর্জিয়ার শীর্ষ নেতৃবৃন্দ তেহরানে উপস্থিত হয়েছেন।

মুক্ত প্রভাত বিশ্লেষণ: এই শেষকৃত্য কেবল একজন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতার বিদায় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি যুদ্ধোত্তর মধ্যপ্রাচ্যের এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ। এককালের চরম শত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান স্থায়ী শান্তি আলোচনার আবহে, এই বিশাল আন্তর্জাতিক জমায়েত তেহরানের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও আঞ্চলিক প্রভাবেরই জানান দিচ্ছে।