৩ জুলাই, ২০২৬

তারেক রহমানের চীন সফরের আলোচনায় নজর রেখে ভারত

তারেক রহমানের চীন সফরের আলোচনায় নজর রেখে ভারত

বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর এবং সেখানে আলোচিত মেগা প্রকল্পগুলোর ওপর কড়া নজর রাখছে নয়াদিল্লি। বিশেষ করে চীন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে যুক্ত করে একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডর গঠন এবং ঢাকা কর্তৃক চীনা যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সম্ভাব্যতা নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারণী মহলে তৈরি হয়েছে প্রচ্ছন্ন উদ্বেগ।

আজ শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ধেয়ে আসে। জবাবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল ভারতের সতর্ক অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে বলেন, "প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর যেকোনো ধরনের কৌশলগত ও ভৌগোলিক ঘটনাপ্রবাহ ভারত অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে ঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

ত্রিপক্ষীয় করিডর ও ঢাকার 'ধীর চলো' নীতি
গেল মাসের শেষ দিকে চীনে তিন দিনের উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর সম্পন্ন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের ‘ব্যাপ্তি বাড়াতে’ বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি বিশেষ অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণের প্রস্তাব দেন।

এই স্পর্শকাতর বিষয়ে ঢাকার অবস্থান জানতে চাওয়া হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, "চীনের প্রস্তাবিত করিডরের বিষয়টি বাংলাদেশ বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে। তবে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে এখনো চূড়ান্ত কোনো অবস্থান নেওয়া হয়নি।"

রাডার স্ক্রিনে 'জে-১০সি' যুদ্ধবিমান ও তিস্তা প্রকল্প
নয়াদিল্লির ব্রিফিংয়ে ভারতীয় সাংবাদিকদের মূল আগ্রহ ছিল প্রতিরক্ষামূলক বাণিজ্যের দিকে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি—বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো চীনের কাছ থেকে অত্যাধুনিক জে-১০সি (J-10C) যুদ্ধবিমান কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে।

এই চুক্তি ভারতের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গিয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, "এই অঞ্চলে যা কিছু আলোচনা হয়, সবই ভারতের রাডারে থাকে। যখন যেমন পদক্ষেপের প্রয়োজন, নয়াদিল্লি তা নেবে।" উল্লেখ্য, এই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের বিষয়ে বাংলাদেশ কিংবা চীন—কোনো পক্ষই এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। এমনকি ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনও এই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

পাশাপাশি, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহের বিষয়ে ভারতের মুখপাত্র স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতায় ভারতের একটি নিজস্ব ও দীর্ঘমেয়াদি 'রোডম্যাপ' রয়েছে। তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে ভারতের সুনির্দিষ্ট মনোভাবের কথা আগেই ঢাকাকে জানানো হয়েছে এবং এর যেকোনো অগ্রগতি ভারতের জাতীয় স্বার্থের আলোকে সার্বিকভাবে বিবেচনা করা হবে।

মুক্ত প্রভাত বিশ্লেষণ: ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে চীন ও ভারত—দুই পরাশক্তিরই নজরকাড়া কেন্দ্রে। ঢাকা একদিকে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার সুযোগ নিতে চাচ্ছে, অন্যদিকে দিল্লির কৌশলগত অস্বস্তিকে প্রশমিত করার চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করছে। এই দুই শক্তির মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন ঢাকার কূটনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।