সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট। দীর্ঘ তিন সপ্তাহের তুমুল আলোচনা, নানামুখী সমালোচনা এবং বিরোধী দলের ক্ষুরধার যুক্তির পর অর্থবিলে ব্যাপক সংশোধন এনে আজ মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এই বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হচ্ছে দেশের ৫৫তম এই বাজেট।
চলতি বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। গত ১১ জুন সংসদে এই মেগা বাজেট পেশ করেছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
জনমনে স্বস্তি: অর্থবিলের ৬৮ সংশোধনীতে বড় ছাড়
এবারের বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল এর অর্থবিলের সংশোধন। বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগের মুখে সোমবার অর্থবিলে মোট ৬৮টি সংশোধনী আনা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সুখবর হলো—করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের ওপর করের চাপ কিছুটা কমবে।
পাশাপাশি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রস্তাবিত নতুন ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে সরকার। একই সাথে ব্যাংক হিসাব সচল করার ক্ষেত্রে টিআইএন (TIN) সংক্রান্ত জটিলতাও দূর করা হয়েছে।
বড় স্বস্তি এসেছে আবাসন খাতেও। জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনে প্রস্তাবিত কম মূল্যে রেজিস্ট্রেশনের ওপর যে বিতর্কিত কড়াকড়ি আরোপের কথা ছিল, তা শতভাগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
‘সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "আমরা অন্ধ বা একগুঁয়ে নই। সংসদ সদস্যদের মূল্যবান মতামত, সমালোচনা ও সুপারিশ বিবেচনা করে জনস্বার্থে বেশ কয়েকটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে।"
— অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য
নাকচ ১,৩৪২টি ছাঁটাই প্রস্তাব
আজ বাজেট পাসের আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা ৫৯টি মঞ্জুরি দাবি উত্থাপন করেন। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা করনীতি, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ নিয়ে কড়া সমালোচনা করে মোট ১ হাজার ৩৪২টি ছাঁটাই প্রস্তাব জমা দেন। তবে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কণ্ঠভোটে সবকটি প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত 'নির্দিষ্টকরণ বিল-২০২৬' পাসের মাধ্যমে বাজেট চূড়ান্ত রূপ পায়।
| সূচক | লক্ষ্যমাত্রা ও পরিমাণ |
| বাজেটের মোট আকার | ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা (গতবারের চেয়ে ১.৪৮ লাখ কোটি বেশি) |
| মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য | ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা |
| এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা | ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা |
| বাজেট ঘাটতি | ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬%) |
| মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ | ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা |
| জিডিপি প্রবৃদ্ধি | ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা |
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ: মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আদায়
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাড়ে ৭ শতাংশে মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনা এবং ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা এই বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের জন্য এক বিশাল এসিড টেস্ট। বিশেষ করে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কতটা পূরণ হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি আর ভ্যাট প্রত্যাহারের মতো সিদ্ধান্তগুলো নতুন সরকারের জনবান্ধব ভাবমূর্তি তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখবে।