৩০ জুন, ২০২৬

ঢাকায় উচ্চ মাত্রায় এডিসের লার্ভা, জেলা শহরগুলোতেও ঝুঁকি

ঢাকায় উচ্চ মাত্রায় এডিসের লার্ভা, জেলা শহরগুলোতেও ঝুঁকি

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দেশজুড়ে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ও উপদ্রব আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এডিস মশার লার্ভা বা শূককীটের উচ্চ মাত্রার উপস্থিতি মিলেছে। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, লার্ভার ঘনত্বের দিক থেকে এবার ঢাকা শহরের চেয়েও ঢাকার বাইরের কিছু জেলা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৯ জুন পর্যন্ত দেশে প্রায় ৬ হাজার ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭২৭ জন—যা বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক। জুনে মৃতের সংখ্যাও এ বছরে সর্বোচ্চ (১৩ জন)। জনস্বাস্থ্যবিদেরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি কেবল ডেঙ্গুর মৌসুমি বৃদ্ধির শুরু; এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

ঝুঁকির সূচকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ
এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পরিমাপের আন্তর্জাতিক সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ (বিআই) ২০ বা তার বেশি হলে তাকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করা হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি (ডিএনসিসি): জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে চালানো জরিপে উত্তর সিটির ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, বেজমেন্ট ও পানির ট্যাংকে লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক পাওয়া গেছে। পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গড় বিআই ছিল ৪০-এর ওপরে, যার সর্বোচ্চ মাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭৩ দশমিক ৩৩।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি (ডিএসসিসি): প্রাক-বর্ষা জরিপে দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে মে মাসের শেষে কক্সবাজার, বরিশাল, বরগুনা ও পিরোজপুরে মশার লার্ভা পরীক্ষা করা হয়। সেই জরিপে দেখা যায়, ঢাকার চেয়েও ঢাকার বাইরের লার্ভার ঘনত্ব অনেক বেশি।
বিশেষ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ব্রুটো ইনডেক্স (বিআই) সর্বনিম্ন ৪৫ থেকে সর্বোচ্চ ৯২ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম এক সতর্কবার্তা। এছাড়া বরিশালে ৩৪ এবং পিরোজপুরে বিআই ৪৩ রেকর্ড করা হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরেও গড় বিআই পাওয়া গেছে প্রায় ৩১।

অনুকূল আবহাওয়া ও ‘রোগতাত্ত্বিক ত্রিভুজ’
অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, ডেঙ্গু ছড়ানোর প্রধান উপাদান—রোগী, মশা, অনুকূল পরিবেশ এবং ডেঙ্গুর জীবাণু (প্যাথোজেন)—এই চারটির সমন্বয়ে গঠিত ‘রোগতাত্ত্বিক ত্রিভুজ’ বর্তমানে দেশে পুরোপুরি সক্রিয় রয়েছে। এর কোনো অংশই ভাঙা সম্ভব হয়নি।

চলতি বছরের আবহাওয়াও এডিসের বংশবৃদ্ধিতে দারুণ সাহায্য করছে। এবার এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবার বর্ষায় টানা বৃষ্টির চেয়ে থেমে থেমে বৃষ্টি এবং উচ্চ তাপমাত্রা থাকার সম্ভাবনা বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা বৃষ্টিতে লার্ভা ধুয়ে গেলেও থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন পাত্রে পানি জমে থাকে, যা এডিস মশার দ্রুত প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।

আক্রান্তের শীর্ষে ঢাকা ও বরিশাল বিভাগ
এক সময় ডেঙ্গুকে ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ ভাবা হলেও এখন তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে ২ হাজার ৯৩ জন (মহানগরে ১,৩৬১ জন)। এর ঠিক পরেই রয়েছে বরিশাল বিভাগ, যেখানে ১ হাজার ৫৮৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। বরিশাল বিভাগের পিরোজপুরে ৩৯১, বরিশালে ৩৮৩, ঝালকাঠিতে ৩০৪ এবং পটুয়াখালীতে ২৭২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১ হাজার ১১৬ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

ঢাকাকেন্দ্রিক মানসিকতা বদলানোর তাগিদ
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের জনস্বাস্থ্যবিদেরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে দ্রুত কৌশল বদলানোর তাগিদ দিয়েছেন। জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজির আহমদ বলেন,

"ডেঙ্গু এখন দেশজোড়া রোগ। কিন্তু আমাদের সেই উপলব্ধি এখনো হয়নি। আমাদের বেশির ভাগ কার্যক্রম এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।"

তিনি বিশেষ করে বরিশাল অঞ্চলের দিকে প্রশাসনকে বাড়তি নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত ক্রাশ প্রোগ্রাম চালানো না হয়, তবে এই বর্ষায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।