কারও শৈশব কেটেছে রেলস্টেশনের চায়ের দোকানে, কাউকে টিকে থাকার লড়াইয়ে রুতি বিক্রি করতে হয়েছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কাউকে বিনিদ্র রাত কাটাতে হয়েছে পাহাড়ের অন্ধকার গুহায়, আবার কারও ব্যক্তিত্বের ইস্পাতকঠিন ভিত্তি গড়ে উঠেছে সামরিক একাডেমির কঠোর শৃঙ্খলায়। আজ তাঁরাই বিশ্বের সবচেয়ে প্রতাপশালী রাষ্ট্রনায়ক। তবে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর এই পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। বইয়ের পাতার পাঠ আর বাস্তবের রুক্ষ লড়াই—এই দুইয়ের মিশেলে কীভাবে তাঁরা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন, বিশ্বের সাত শীর্ষ নেতার সেই সংগ্রামী জীবন ও অজানা জয়গাথা নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন।
শৈশব ও শৃঙ্খলা: ১৯৪৬ সালে নিউইয়র্কের এক ধনী ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম হলেও শৈশবে বেশ উদ্ধত স্বভাবের ছিলেন ট্রাম্প। তাঁকে শৃঙ্খলায় আনতে ১৩ বছর বয়সে ‘নিউইয়র্ক মিলিটারি একাডেমি’তে পাঠিয়ে দেন বাবা-মা, যা তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।
শিক্ষাজীবন: প্রথমে ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটিতে পড়লেও পরে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার বিখ্যাত ‘হোয়ার্টন স্কুল অব ফিন্যান্স অ্যান্ড কমার্স’ থেকে ১৯৬৮ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
ব্যতিক্রমী তথ্য: ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় চারবার শিক্ষাবিরতি ও একবার পায়ের সমস্যার কথা বলে সামরিক চাকরি এড়িয়েছিলেন, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। তাঁর বড় ভাই অতিরিক্ত মদ্যপানে মারা যাওয়ায় ট্রাম্প জীবনে কখনো মদ, ধূমপান বা মাদক গ্রহণ না করার কঠোর শপথ নেন, যা আজ ৮০ বছর বয়সেও মেনে চলেন। এনবিসির রিয়ালিটি শো ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’-এর সঞ্চালক হিসেবে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পান। ২০২৪ সালে ইতিহাস গড়ে দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউজে কামব্যাক করেন তিনি।
ইঁদুরের সেই মরণকামড় ও জীবনশিক্ষা: ১৯৫২ সালে তৎকালীন লেলিনগ্রাদে জন্ম নেওয়া পুতিনের শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্যে, একটি সাধারণ ‘কমিউনাল’ অ্যাপার্টমেন্টে। শৈশবে সিঁড়িতে একটি ইঁদুরকে কোণঠাসা করতে গিয়ে ইঁদুরটির পাল্টা আক্রমণের শিকার হন তিনি। তাঁর আত্মজীবনী ‘ফার্স্ট পারসন’–এ পুতিন লিখেছেন, ‘কাউকে কখনো এমনভাবে কোণঠাসা করো না যে তার পালানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, তখন সে মরণকামড় দেবেই।’
শিক্ষাজীবন ও গোয়েন্দাগিরি: বিশৃঙ্খলা থেকে নিজেকে বাঁচাতে জুডোর শরণ নেন এবং পরে লেলিনগ্রাদ স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৭৫ সালে আইনে স্নাতক ও পরবর্তীতে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন। এরপরই সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে (KGB) যোগ দিয়ে পূর্ব জার্মানিতে দায়িত্ব পালন করেন। পুতিনও ট্রাম্পের মতো মদপান থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকেন এবং জুডোতে ব্ল্যাক বেল্টধারী।
পর্দার আড়ালে প্রস্তুতি: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনি (জন্ম ১৯৬৯)। তেহরানের অভিজাত ‘আলাভি’ হাইস্কুলে পড়া শেষে ১৯৮৭ সালে রেভোল্যুশনারি গার্ডসে (IRGC) যোগ দিয়ে সরাসরি ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন।
ধর্মীয় পাণ্ডিত্য: ইরানের পবিত্র শহর কোমের ঐতিহ্যবাহী সেমিনারিতে ইসলামি আইন (ফিকহ) এবং দর্শনের ওপর উচ্চতর শিক্ষা নেন। ২০২২ সালে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তাঁকে প্রথমবারের মতো ‘হুজাতুল ইসলাম’ থেকে ‘আয়াতুল্লাহ’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়, যার অর্থ তিনি এখন স্বাধীনভাবে ‘ইজতিহাদ’ (ইসলামি আইনের ব্যাখ্যা) করার যোগ্য। বর্তমানে তিনি উচ্চতর ফিকহ শাস্ত্রের পাঠদান করছেন এবং বাবার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন।
বারুদ আর বইয়ের সহাবস্থান: ১৯৪৯ সালে তেল আবিবে জন্ম হলেও বাবার ইতিহাস গবেষণার সূত্রে নেতানিয়াহুর বড় হওয়া আমেরিকায়। ১৯৬৭ সালে হাইস্কুল শেষ করেই ইসরায়েলে ফিরে এলিট স্পেশাল ফোর্স ‘সায়েরেত মাতকাল’-এ যোগ দেন। ৫ বছর সামরিক জীবন কাটিয়ে ১৯৭২ সালে এমআইটিতে (MIT) স্থাপত্যবিদ্যায় পড়া শুরু করেন। কিন্তু এক বছর পরেই ১৯৭৩ সালে ‘ইয়োম কিপুর যুদ্ধ’ শুরু হলে পড়া ফেলে বন্দুক হাতে রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
উচ্চশিক্ষা: যুদ্ধ শেষে এমআইটিতে ফিরে দ্বিগুণ উদ্যমে ১৯৭৫ সালে স্থাপত্যে স্নাতক এবং ১৯৭৬ সালে বিখ্যাত ‘স্লোন স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট’ থেকে মাত্র এক বছরে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর (MS) ডিগ্রি নেন। একই সাথে হার্ভার্ড ও এমআইটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গভীর পাঠ নেন, যা তাঁকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে একজন তুখোড় তার্কিক হিসেবে পরিচিতি দেয়।
রাস্তায় রুটি বিক্রি থেকে মসনদে: বাবা ছিলেন কোস্টগার্ডের সাধারণ কর্মচারী। ইস্তাম্বুলের কাসিমপাশার মতো রুক্ষ ও দরিদ্র এলাকায় বড় হওয়া এরদোয়ানকে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে শৈশবে রাস্তায় লেবুর শরবত ও ‘সিমিত’ (একধরনের তুর্কি রুটি) বিক্রি করতে হতো।
ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার লড়াই: তিনি ভর্তি হন ধর্মীয় বৃত্তিমূলক স্কুল ‘ইমাম হাতিপ’-এ। সেখান থেকে ১৯৭৩ সালে পাস করার পর তৎকালীন ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্কে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আইনি বাধা দূর করতে ‘আইয়ুপ হাইস্কুল’ থেকে পুনরায় সাধারণ ডিপ্লোমা পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন। পরে মারমারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮১ সালে অর্থনীতি ও জনপ্রশাসনে স্নাতক করেন।
ফুটবলার এরদোয়ান: তরুণ বয়সে তিনি চমৎকার ফুটবল খেলতেন। নামী ক্লাব ‘ফেনারবাচে’ তাঁকে দলে নিতে চাইলেও বাবার আপত্তিতে পেশাদার ফুটবলার হতে পারেননি। তবে মাঠের সেই দলগত নেতৃত্বই আজ তাঁকে তুরস্কের একচ্ছত্র নেতায় পরিণত করেছে।
অভিজাত জীবন থেকে পাহাড়ের গুহায়: সি চিন পিংয়ের বাবা সি ঝংশুন ছিলেন চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী। ফলে শৈশব রাজকীয় হলেও ১৯৬২ সালে বাবার রাজনৈতিক পতনের পর তাঁদের পুরো পরিবার চরম লাঞ্ছনার শিকার হয়। মাও সে-তুংয়ের ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’-এর সময় ১৫ বছর বয়সী সি চিন পিংকে সুদূর শানসি প্রদেশের লিয়াংজিয়াহে গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ ৭ বছর তিনি একটি পোকামাকড়ে ভরা পাহাড়ে মাটির গুহায় বসবাস করেন এবং সাধারণ কৃষকদের সাথে সার বহন ও চাষাবাদের কঠোর কায়িক পরিশ্রম করেন। সি বলেন, এই গুহাজীবনই তাঁকে সাধারণ মানুষের দুঃখ বুঝতে শিখিয়েছে।
শিক্ষা ও তাত্ত্বিক ভিত্তি: ১৯৭৫ সালে চীনের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শ্রমিক-কৃষক-সৈনিক’ কোটায় রসায়ন প্রকৌশলে ভর্তি হন। পরে ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘মার্ক্সীয় তত্ত্ব ও আদর্শিক রাজনীতি’র ওপর গবেষণা করে আইনে ডক্টরেট (PhD) ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর এই তাত্ত্বিক দর্শনই আজকের ‘সি চিন পিং থট’, যা চীনের সংবিধানেও অন্তর্ভুক্ত।
স্টেশনের চা বিক্রেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী: ১৯৫০ সালে গুজরাটের এক অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম মোদির। অভাবের সংসারে ভাদনগর রেলস্টেশনে বাবার ছোট চায়ের দোকানে স্কুল খোলার আগে ও পরে চা বিক্রি করতেন তিনি।
হিমালয়ের বৈরাগ্য ও উচ্চশিক্ষা: ভাদনগরের স্থানীয় স্কুলে পড়ার সময় লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই পড়া তাঁর স্বভাব ছিল। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি আধ্যাত্মিকতার খোঁজে ঘর ছেড়ে একাই ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন এবং হিমালয়ের বিভিন্ন আশ্রমে দীর্ঘ দুই বছর কাটান। এই বৈরাগ্যই তাঁর চরিত্রে কঠোর শৃঙ্খলা এনে দেয়। পরবর্তীতে তিনি গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে মোদি সম্পূর্ণ নিরামিষাশী, নেশামুক্ত এবং প্রতিদিন নিয়ম করে যোগব্যায়াম করেন, যা তাঁকে প্রতিদিন প্রায় ১৮ ঘণ্টা কাজ করার শক্তি জোগায়।
| রাষ্ট্রনায়ক | শৈশব/কৈশোরের সংগ্রাম | শিক্ষাগত যোগ্যতা | জীবনের মূল শিক্ষা/অভিজ্ঞতা |
| ডোনাল্ড ট্রাম্প | উদ্ধত স্বভাবের কারণে সামরিক একাডেমির কঠোর শৃঙ্খলায় বড় হওয়া | অর্থনীতিতে স্নাতক (হোয়ার্টন স্কুল) | ভাইয়ের অকাল মৃত্যু দেখে আজীবন নেশামুক্ত থাকার শপথ। |
| ভ্লাদিমির পুতিন | তিন পরিবারের সাথে সাধারণ কমিউনাল অ্যাপার্টমেন্টে বড় হওয়া | আইন বিষয়ে স্নাতক, অর্থনীতিতে পিএইচডি | কোণঠাসা ইঁদুরের পাল্টা আক্রমণ থেকে ‘কাউকেও মরণকামড় দিতে বাধ্য না করার’ শিক্ষা। |
| মোজতবা খামেনি | ইসলামি বিপ্লবের ডামাডোলে বেড়ে ওঠা, ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া | উচ্চতর ফিকহ (ইসলামি আইন) শাস্ত্রের সর্বোচ্চ ডিগ্রি | কোম সেমিনারিতে দীর্ঘ নিভৃত ধর্মীয় সাধনা ও ‘আয়াতুল্লাহ’ পদবি অর্জন। |
| বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু | শৈশবেই আমেরিকায় অভিবাসী হওয়া, দেশের টানে দুইবার যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া | স্থাপত্যে স্নাতক (MIT), ব্যবসায় প্রশাসনে এমএস (MIT) | বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ ও করপোরেট দুনিয়ার অভিজ্ঞতা এবং সামরিক এলিট ফোর্সের দিনগুলো। |
| রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান | পড়াশোনার খরচ চালাতে রাস্তায় লেবুর শরবত ও রুতি বিক্রি | অর্থনীতি ও জনপ্রশাসনে স্নাতক (মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়) | ‘ইমাম হাতিপ’ স্কুলের ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মাঠের ফুটবল থেকে শেখা দলগত সংহতি। |
| সি চিন পিং | বাবার রাজনৈতিক পতন, ১৫ বছর বয়সে নির্বাসিত হয়ে ৭ বছর পাহাড়ি গুহায় বাস | রসায়ন প্রকৌশলে স্নাতক, আইনে ডক্টরেট (সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়) | গুহাজীবনের চরম কষ্ট এবং সাধারণ কৃষকদের সাথে কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে মানুষের মন বোঝা। |
| নরেন্দ্র মোদি | রেলস্টেশনে বাবার চায়ের দোকানে চা বিক্রি করা | রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়) | হিমালয়ের আশ্রমে আশ্রমে ঘুরে বেড়ানো এবং আরএসএস (RSS)-এর নিবেদিত মাঠপর্যায়ের কাজ। |