২৯ জুন, ২০২৬

মহাতারকা বনাম দলগত রসায়ন: ২০২৬ বিশ্বকাপে কার ওপর কতটা নির্ভরশীল দল?

মহাতারকা বনাম দলগত রসায়ন: ২০২৬ বিশ্বকাপে কার ওপর কতটা নির্ভরশীল দল?

ফুটবলে শেষ পর্যন্ত দলগত পারফরম্যান্সই শেষ কথা। কিন্তু কিছু মহাতারকা থাকেন যারা নিজেদের অতিমানবীয় স্পর্শে একাই বদলে দিতে পারেন ম্যাচের ভাগ্যরেখা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের চলমান আসরে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে চোখ রাখলেই তা স্পষ্ট। ৩ ম্যাচে ৬ গোল করে সবার ওপরে লিওনেল মেসি।

পেছনেই ৪টি করে গোল নিয়ে তাড়া করছেন এমবাপ্পে, দেম্বেলে, হলান্ড ও ভিনিসিয়ুস। এই মেগা তারকাদের নিয়ে সম্প্রতি একটি চমকপ্রদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে ‘ইএসপিএন গ্লোবাল স্পোর্টস রিসার্চ’। ২০২২ বিশ্বকাপের পর থেকে দলগুলোর পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে তারা খুঁজে বের করেছে—কোন দলটি তাদের মহাতারকার ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল?

ফলাফল ও পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণটি নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. আর্লিং হলান্ড (নরওয়ে) — সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল
পরিসংখ্যান বলছে, এই বিশ্বকাপে নরওয়ের ক্ষেত্রে সত্যিটা হলো—‘নো হলান্ড, নো পার্টি’। হলান্ড নরওয়ের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্বের অন্য কোনো দল তাদের সেরা তারকার ওপর ততটা নির্ভরশীল নয়।

হলান্ডসহ জয়ের হার: ৬৯%

হলান্ডহীন জয়ের হার: ২৫% (এক ধাক্কায় নিচে)

গোলের অনুপাত: হলান্ড থাকলে দল গোল করেছে৭৪টি, না থাকলে মাত্র ২১টি।

দলের মোট গোলে অবদান: ২০২২ সালের পর থেকে নরওয়ের মোট গোলের আকাশচুম্বী ৪০ শতাংশই এসেছে হলান্ডের পা থেকে (৩৮ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট)।

২. হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড) — থ্রি লায়ন্সের আসল চালিকাশক্তি
টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড দল যে বায়ার্ন মিউনিখের এই ফরোয়ার্ডের ওপর কতটা নির্ভরশীল, তা সংখ্যাগুলোই চিৎকার করে বলছে। কেইন না থাকলে ইংল্যান্ড যেন পথ হারিয়ে ফেলে।

কেইনসহ জয়ের হার: ৭৬%

কেইনহীন জয়ের হার: মাত্র ২৯%

গোলের অনুপাত: কেইন মাঠে থাকলে ইংল্যান্ড করেছে ৭৩ গোল, তিনি না থাকলে তা নেমে আসে মাত্র ১৯-এ!

দলের মোট গোলে অবদান: এই সময়ে ইংল্যান্ডের মোট গোলের ৩২ শতাংশই করেছেন কেইন, যা মেসি বা রোনালদোর চেয়েও বেশি।

৩. কিলিয়ান এমাবপ্পে (ফ্রান্স) — ব্লুজদের জয়ের তফাত
উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে বা বারকোলার মতো তারকারা থাকলেও কিলিয়ান এমবাপ্পেই ফ্রান্সের আসল ‘এক্স-ফ্যাক্টর’।

এমবাপ্পেসহ জয়ের হার: ৭১%

এমবাপ্পেহীন জয়ের হার: ৫০%

সুযোগ তৈরি: এমবাপ্পে মাঠে থাকাকালীন দল ৪৭২টি সুযোগ তৈরি করেছে, তিনি না থাকলে তা নেমে আসে ১৫৪-তে (৩ গুণেরও কম)।

দলের মোট গোলে অবদান: ২০২২ সাল থেকে ফরাসিদের মোট গোলের ২৪ শতাংশ এসেছে তার পা থেকে।

৪. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) — পরিসংখ্যানের বড় চমক!
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ৮টি গোলের মধ্যে ৬টিই মেসির। টানা ৭ ম্যাচে গোল করার অবিশ্বাস্য কীর্তিও গড়েছেন। তবে ইএসপিএন-এর পরিসংখ্যান বলছে এক চমকপ্রদ তথ্য—আর্জেন্টিনা মোটেও ‘ওয়ান-ম্যান টিম’ নয়!

মেসিসহ জয়ের হার: ৮৩%

মেসীহীন জয়ের হার: ৮৩% (একদম সমান)

তফাত যেখানে: মেসি মাঠে থাকলে গোলের হার বাড়ে। মেসি থাকাকালীন আর্জেন্টিনা গোল করেছে ৫৮টি, আর না থাকলে ৩৫টি। দলের মোট গোলের ২৭ শতাংশে রয়েছে তার নাম (২৫ গোল, ৯ অ্যাসিস্ট)। তবে মেসিকে ছাড়াও আর্জেন্টিনা সমান সমীহজাগানিয়া দল।

৫. ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল) — মাঠে থাকাই অনুপ্রেরণা
৪১ বছর বয়সেও চলতি বিশ্বকাপে ২ গোল করেছেন সিআর সেভেন। কলম্বিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচে নিষ্প্রভ থাকলেও রবার্তো মার্তিনেজের দলে তার উপস্থিতিই বড় শক্তি।

রোনালদোসহ জয়ের হার: ৬৭%

রোনালদোহীন জয়ের হার: ৬৩%

প্রভাব: তিনি মাঠে থাকলে পর্তুগাল দলগতভাবে এগিয়ে থাকে। তিনি থাকলে দল গোল বেশি করে (৬৮ বনাম ৪০) এবং সুযোগ তৈরি করে বেশি (৩৮১ বনাম ১৮৫)। তবে পর্তুগালের ৭৫% গোলই এসেছে অন্য ফুটবলারদের পা থেকে।

৬. ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (ব্রাজিল) — ভিনি ছাড়াই ব্রাজিল সফল?
কার্লো আনচেলত্তির এই ব্রাজিল দলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তবে সেলেসাওদের জার্সিতে ২৫ বছর বয়সী এই তারকার সামগ্রিক রেকর্ড কিছুটা মলিন (৫২ ম্যাচে ১৩ গোল)।

ভিনিসহ জয়ের হার: ৪৪%

ভিনিহীন জয়ের হার: ৬৩% (উল্টো বেশি!)

প্রভাব: ভিনি যখন খেলেন, দল গোল বেশি পায় (৪৮ বনাম ২৫) এবং সুযোগও তৈরি হয় বেশি (২৬৯ বনাম ১২০)। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোল করার হার কম হওয়ায় ভিনি না থাকলেও ব্রাজিল ভালোই মানিয়ে নেয়।

৭. লামিনে ইয়ামাল (স্পেন) — একক নির্ভরতাহীন স্প্যানিশ আর্মাডা
লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন এমন এক দল, যারা একক কোনো গোলদাতার ওপর নির্ভরশীল নয়। বার্সার বিস্ময়বালক ইয়ামালকে ছাড়াও স্পেনের জয়ের রেকর্ড দুর্দান্ত।

ইয়ামালসহ জয়ের হার: ৭১%

ইয়ামালহীন জয়ের হার: ৭৫%

দলের মোট গোলে অবদান: ২০২৩ সালে অভিষেকের পর থেকে স্পেনের মোট গোলের মাত্র ৬ শতাংশ এসেছে তার পা থেকে। ইয়ামাল স্পেনের আক্রমণের অন্যতম বড় অস্ত্র হলেও, তাকে ছাড়াও স্পেন বেশ ভালোভাবেই ম্যাচ জিততে পারে।

সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত:

পরিসংখ্যানের বিচারে এই বিশ্বকাপে আর্লিং হলান্ড (নরওয়ে) এবং হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড) তাদের নিজ নিজ দলের জন্য সবচেয়ে অপরিহার্য ফুটবলার। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা ও স্পেন মাঠে মহাতারকাদের উপস্থিতি ছাড়াও দলগতভাবে সমান ভয়ংকর।