২৮ জুন, ২০২৬

করিডোর ঘিরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে

করিডোর ঘিরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার পাঁচ দশকের কূটনৈতিক সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে দুই দেশ ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করেছে। তবে এই সফরে নগদ প্রাপ্তির হিসাব নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বাংলাদেশ এখন আত্মসম্মানের এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে সরকারপ্রধান ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে অন্য দেশে যান না।

রোববার (২৮ জুন) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত চীন সফর নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম।

‘নগদ প্রাপ্তির প্রশ্ন করবেন না, একটু আত্মসম্মান রাখুন’
সংবাদ সম্মেলনে সফরে বাংলাদেশের ‘নগদ প্রাপ্তি’ কী—একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

"আপনি নগদ প্রাপ্তির কথা বললেন। ভাই, এ সমস্ত প্রশ্ন করবেন না, আমরা খুব বিব্রতবোধ করি। এখানে উনি (প্রধানমন্ত্রী) ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যান নাই। এখানে গেছেন দুই দেশের সম্পর্কের অভিমুখ, তার কনটেন্ট এবং তার উচ্চতা, ব্যাপ্তি ও গভীরতা—এটা এস্টাবলিশ (প্রতিষ্ঠা) করার জন্য। বাকিগুলো পরে আসবে।"

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও যোগ করেন, "কোনো দিন সরকারপ্রধান আরেক সরকারপ্রধানের সঙ্গে কাগজ-পেনসিল নিয়ে নগদ হিসাব করতে বসেন না। একটু আত্মসম্মান রাখেন। আমরা অন্য জায়গায় পৌঁছে গেছি, এটা বিশ্বাস করুন।"

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের বড় প্রস্তাব
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং দুই দেশের অর্থনৈতিক ব্যাপ্তি বাড়াতে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডর প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছেন। কুনমিং থেকে মিয়ানমারের বন্দরগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা গেলে পণ্য পরিবহন খরচ ও সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।

এই করিডরে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইলে খলিলুর রহমান বলেন, "চীনের প্রস্তাবিত করিডর নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত অবস্থান আমরা নিইনি।"

তিনি আরও জানান, এশিয়ায় থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো হাতে গোনা কয়েকটি দেশের সঙ্গে চীনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অংশীদারত্ব রয়েছে, এখন বাংলাদেশও সেই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় যুক্ত হলো। এছাড়া তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়ে প্রথমবারের মতো দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা মিলে একটি যৌথ কারিগরি সমীক্ষা করার বিষয়ে নীতিগত আলোচনা হয়েছে।

১০০% শুল্কছাড় ও ভূ-রাজনীতিতে ভারতের উদ্বেগ
নির্বাচনের পর ভারত ও মালয়েশিয়ার আমন্ত্রণ থাকলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেন এবং সেখান থেকে চীন সফরে যান। বাংলাদেশের এই চীন সফরকে ভারতের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে একটি ‘তাৎপর্যপূর্ণ মোড়’ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশেষ করে মোংলা বন্দরের অর্থনৈতিক অঞ্চল ও তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে।

এবারের ১৪ ধারার যৌথ ইশতেহারে চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য শুল্কছাড় ৯৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ করা হয়েছে, যা দেশের বাণিজ্য খাতের জন্য একটি বড় ইতিবাচক মাইলফলক। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, যৌথ ইশতেহারের উপস্থাপনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বেইজিং এবার ঢাকাকে নিজের প্রভাববলয়ে রাখতে অতীতের তুলনায় অনেক বেশি নমনীয় ছিল।

ভবিষ্যৎ-মুখী সিদ্ধান্তের আড়ালে প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৫ ও ২০০৫ সালের পর দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে এটি তৃতীয় যৌথ ইশতেহার, যা আর্থিক প্রকল্পের চেয়ে রাজনৈতিক আস্থা ও মর্যাদাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। তবে এই সফলতার মধ্যেও কিছু ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা:

চীনের চার বৈশ্বিক উদ্যোগ: বাংলাদেশ চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগে (GDI) যুক্ত হতে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। তবে বাকি তিন উদ্যোগ—বৈশ্বিক নিরাপত্তা (GSI), বৈশ্বিক সভ্যতা (GCI) এবং বৈশ্বিক সুশাসন (GGI) উদ্যোগের বিষয়ে বাংলাদেশের ভূমিকা এখনো ধোঁয়াশাপূর্ণ।

পুনরেকত্রীকরণ নীতিতে সমর্থন: এবারই প্রথম বাংলাদেশ চীনের ‘পুনরেকত্রীকরণ’ (Reunification) নীতির প্রতি জোরালো সমর্থনের কথা জানিয়েছে, যা জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি মোহাম্মদ সুফিউর রহমান মন্তব্য করেন, স্বল্পতম সময়ের প্রস্তুতিতে আয়োজিত এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ভবিষ্যৎ-মুখী। তবে মূল কাজটা শুরু হলো সফর শেষ হওয়ার পর। রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এই বড় সিদ্ধান্তগুলো পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জটাই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।