জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশে জাকাত ব্যবস্থাপনার জন্য সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি এবং ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়ার জোরালো প্রস্তাব করেছেন বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ। তবে ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে তাঁর এই প্রস্তাবের সূত্র ধরে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও চাকরি বৈষম্য নিয়ে এক উত্তপ্ত এবং অনির্যাতিত বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
শনিবার (২৭ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বাজেট অধিবেশনে এই ঘটনা ঘটে।
ইসলামি ব্যাংকিং ও জাকাত ডেটাবেজের প্রস্তাব
যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়ার উদাহরণ টেনে আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, বর্তমান বিশ্বে কনভেনশনাল বা চড়া সুদের ঋণ ব্যবস্থার (শাইলক সিস্টেম) বিপরীতে ইসলামি ব্যাংকিং একটি শক্তিশালী ট্রেন্ড বা প্রবণতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন:
"আমরা ডিভাইন ব্লেসিং বা ঐশ্বরিক রহমতে বিশ্বাস করি। দেশে ইসলামিক ব্যাংকিং যত প্রমোটেড হবে, আল্লাহ–তাআলার সেই রহমত আমাদের ওপরে তত বেশি আসবে।"
এর পাশাপাশি বাংলাদেশের জাকাত খাতকে একটি ‘হিডেন ইকোনমি’ বা লুকানো অর্থনীতি আখ্যা দিয়ে পার্থ বলেন, দেশে মোট কত টাকা জাকাত দেওয়া হয় তার সঠিক হিসাব সরকারের কাছে নেই। তাই নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক প্রকৃত জাকাত পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা নিয়ে একটি জাতীয় ডেটাবেজ তৈরির প্রস্তাব করেন তিনি। এছাড়া, বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, স্টার্টআপ ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের প্রশংসা করে একে ‘জনবান্ধব’ বলে অভিহিত করেন এবং ভোলার গ্যাস সম্পদ কাজে লাগাতে বিশেষ উন্নয়ন কমিটি গঠনের দাবি জানান।
‘ব্যাংক তো মসজিদ-মাদ্রাসা না’: গয়েশ্বর চন্দ্র রায়
আন্দালিভ রহমান পার্থের বক্তব্যের পরই ফ্লোর নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলেন বিএনপির সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইসলামী ব্যাংকে অমুসলিমদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যা বিএনপির আদি লক্ষ্য ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শের পরিপন্থী।
নিজের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে গয়েশ্বর রায় বলেন,
"ইসলামী ব্যাংকের একজন পরিচালক, যিনি জামায়াতের রাজনীতি করেন, তাঁকে আমি একজনের চাকরির জন্য সুপারিশ করেছিলাম। নাম পাঠানোর পর তিনি বললেন—‘দাদা সরি, ও তো হিন্দু, এই চাকরি তো আমি দিতে পারব না।’"
তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে গয়েশ্বর প্রশ্ন রাখেন, "দেশ কি শুধু মুসলমানদের জন্য স্বাধীন হয়েছে? ব্যাংক তো কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসা না যে সেখানে অন্য ধর্মের মানুষ চাকরি করতে পারবে না।" তিনি এটিকে স্পষ্ট বৈষম্য আখ্যা দিয়ে আন্দালিভ রহমান পার্থের কাছে এর ব্যাখ্যা দাবি করেন।
পার্থের ব্যক্তিগত কৈফিয়ত ও জামায়াত নেতার স্পষ্টীকরণ
গয়েশ্বরের বক্তব্যের পর ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিতে দাঁড়িয়ে আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, অমুসলিমরা ইসলামি ব্যাংকিংয়ে চাকরি করতে পারবেন না—এমন কোনো নিয়মের কথা তাঁর জানা নেই। বিশ্বজুড়ে অমুসলিমদের মধ্যেও এখন ইসলামি ব্যাংকিং জনপ্রিয় হচ্ছে।
এই পর্যায়ে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সাম্প্রদায়িক রূপ নিচ্ছে উল্লেখ করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মন্তব্য করেন, সংসদে অনেক সময় অনুমাননির্ভর কথাবার্তা হয়।
এরপর বিতর্কের অবসান ঘটাতে ফ্লোর নেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। তিনি গয়েশ্বর রায়ের দাবি নাকচ করে দিয়ে স্পষ্ট জানান:
"ইসলামী ব্যাংকে যেকোনো ধর্মাবলম্বী নাগরিক চাকরি করতে পারেন। খোদ আমার নিজের নির্বাচনী এলাকারই হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক যোগ্য ব্যক্তি বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকে অত্যন্ত সুনামের সাথে চাকরি করছেন।"
ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মতো একটি অর্থনৈতিক নিয়ামক নিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা শেষ পর্যন্ত সংসদে ধর্মীয় সমঅধিকার ও কর্মসংস্থানের নীতিমালার চুলচেরা বিতর্কে রূপ নেয়।