২৭ জুন, ২০২৬

‘এটা জঘন্য বিশ্বকাপ, আমাদের সাথে চরম অবিচার করা হয়েছে’: ইরানি অধিনায়ক

‘এটা জঘন্য বিশ্বকাপ, আমাদের সাথে চরম অবিচার করা হয়েছে’: ইরানি অধিনায়ক

মাঠের লড়াইয়ে শেষ মুহূর্তের গোল বাতিলের ক্ষত তো ছিলই, তার ওপর যোগ হলো মাঠের বাইরের রাজনৈতিক ও লজিস্টিক হয়রানির পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। মিসরের বিপক্ষে ম্যাচ ড্র করে নকআউট পর্বের সমীকরণ জটিল হওয়ার পর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না ইরান অধিনায়ক মেহদী তারেমি। রাখঢাক না রেখেই সরাসরি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফা এবং আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপে ইরানের সাথে ‘চরম অন্যায়’ ও ‘অবিচার’ করা হয়েছে বলে বিস্ফোরক দাবি করেছেন এই তারকা ফরোয়ার্ড।

ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ভিসা জটিলতা এবং অমানবিক ভ্রমণ সূচির ধকল নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে অংশ নিতে হচ্ছে ইরানকে। মিসরের বিপক্ষে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে শেষ মুহূর্তে গোল করেও ভিএআরের (VAR) কারণে তা বাতিল হওয়ায় ম্যাচটি ১-১ ড্র হয়। আর এর পরপরই সংবাদমাধ্যমে টুর্নামেন্টের ভেতরের নানা অন্ধকার দিক নিয়ে মুখ খোলেন তারেমি।

ভিসা জটিলতা ও মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্রের ‘শাটল রান’ ভোগান্তি
তারেমির ক্ষোভের কারণগুলো শুধু মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ইরান দলকে চরম বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে:

ক্যাম্প বদল: ইরানের মূল অনুশীলন ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক কারণে তা বাতিল করে মেক্সিকোতে নিয়ে যাওয়া হয়।

অমানবিক ভ্রমণ সূচি: প্রথমে কথা ছিল ম্যাচের দুই দিন আগে ইরান দল যুক্তরাষ্ট্রে আসবে এবং ম্যাচের পরদিন মেক্সিকো ফিরবে। কিন্তু ফিফা পরে অদ্ভুত নিয়ম জারি করে যে, ইরানকে ম্যাচের আগের দিন এসে ৯০ মিনিটের খেলা শেষে ওই দিনই আবার মেক্সিকোর তিহুয়ানায় ফিরে যেতে হবে।

স্টাফদের ভিসা প্রত্যাখ্যান: রাজনৈতিক বৈরিতার জেরে ইরান ফুটবল দলের লজিস্টিক ও সাপোর্ট স্টাফদের একটি বড় অংশকে ভিসাই দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ফলে মাঠের বাইরে খেলোয়াড়দের সাহায্য করার মতো পর্যাপ্ত মানুষ নেই।

‘তারা চায় আমরা বাদ পড়ে যাই’
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর দেওয়া আশ্বাসকে ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে মেহদী তারেমি বলেন:

"এটা একটা জঘন্য বিশ্বকাপ। ফিফার উচিত ছিল সব সমস্যার সমাধান করা, কিন্তু শুরু থেকেই তারা ব্যর্থ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর ইনফান্তিনো আমাদের ড্রেসিংরুমে এসে বলেছিলেন, ‘এটি তো কেবল শুরু...।’ অথচ আগামীকাল গ্রুপ পর্ব শেষ হতে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের লজিস্টিক দলের কোনো মানুষ এখনও এখানে আসতে পারেনি, কারণ তারা ভিসাই পায়নি।"

পেশাদার ফুটবলার হিসেবে এমন বৈষম্যমূলক ভ্রমণ সূচি মেনে নেওয়া অসম্ভব উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "আমাদের কেন বারবার মেক্সিকোর তিহুয়ানা থেকে যাতায়াত করতে হবে? আমরা মেক্সিকোর মানুষকে পছন্দ করি। কিন্তু একজন পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে এমন একটি মেগা টুর্নামেন্টে এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটা চরম অবিচার।"

ইরান বিশ্বকাপে থাকুক—আদৌ কর্তৃপক্ষ তা চায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তারেমি হতাশা মেশানো কণ্ঠে বলেন,

"আমাদের এখানে মাঠ ও মাঠের বাইরে সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। লোকে কী চায়, আমি জানি না। তবে আমাদের মনে হচ্ছে, হ্যাঁ, তারা সম্ভবত এটাই পছন্দ করছে যে আমরা বাদ পড়ে যাই। তা না হলে ৯০ মিনিট খেলার পর আমাদের আবার তিহুয়ানায় ফিরে যেতে বাধ্য করা হবে কেন? তারা যদি চায় আমরা বাদ পড়ে যাই, তাহলে ঠিক আছে; আমরা বাদই পড়ে যাচ্ছি।"

ভাগ্য ঝুলে রইল সুতোয়
মিসরের সঙ্গে ড্র করার পর ৩ ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইরান। নতুন নিয়ম অনুযায়ী ১২টি গ্রুপের মধ্যে সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দল যাবে শেষ ৩২ বা রাউন্ড অব থার্টি-টু-তে। ইরান বর্তমানে সেই তালিকার ষষ্ঠ স্থানে থাকলেও, তাদের পরের পর্বে যাওয়ার ভাগ্য এখন পুরোপুরি ঝুলে আছে বাকি গ্রুপগুলোর শেষ ম্যাচের ফলাফলের ওপর। তবে মাঠের ফুটবলে ইরান টিকে থাকবে কি না তা সময় বলবে, কিন্তু তারেমির এই বিস্ফোরক মন্তব্য বিশ্বকাপের গায়ে যে কলঙ্কের দাগ লাগাল, তা নিশ্চিত।