২৬ জুন, ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৫৮৯, নিখোঁজ অর্ধলক্ষ

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৫৮৯, নিখোঁজ অর্ধলক্ষ

‘আমার সন্তান ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে। ওকে বের করব কীভাবে?’—কান্নাভেজা কণ্ঠে বুকফাটা এই আর্তনাদ করছিলেন বাবা ইয়ামিলেথ জিমেনেজ। লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের এক ধসে পড়া সাততলা ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে দিশাহারা এই পিতা। তাঁর ১৯ বছর বয়সী ছেলেটি এখনো চাপা পড়ে আছে কংক্রিটের নিচে। জিমেনেজের মতো হাজারো মানুষের এমন হৃদয়বিদারক আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে ভেনেজুয়েলার আকাশ-বাতাস।

স্থানীয় সময় গত বুধবার সন্ধ্যায় পরপর দুটি শক্তিশালী (৭.২ ও ৭.৫ মাত্রা) ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ভেনেজুয়েলা। আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এই দুর্যোগে আজ শুক্রবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮৯ জনে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে যে পরিমাণ মানুষ চাপা পড়ে আছেন, তাতে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) আশঙ্কা করছে, মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুমানিক নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করা না হলেও, একটি সরকারি ওয়েবসাইটে নিখোঁজ ব্যক্তিদের যে তালিকা করা হয়েছে, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। সেখানে ইতিমধ্যেই নাম উঠেছে ৪৯ হাজার ৬০০ জনের! জাতিসংঘের হিসাবে, এই প্রলয়ঙ্করি ভূমিকম্পের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে যাচ্ছে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৭০ লাখ মানুষের ওপর।

মশাল জ্বালিয়ে, খালি হাতেই চলছে বাঁচার লড়াই
ভূমিকম্পের পর গত বৃহস্পতিবার রাতেও বিভিন্ন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ভেসে আসছিল আটকে পড়া মানুষের গোঙানি আর বাঁচার আকুতি। কিন্তু বিপর্যয় আরও বাড়িয়েছে বিদ্যুৎহীন অন্ধকার। আলো না থাকায় অনেক জায়গায় মশাল জ্বালিয়ে ও মোবাইল ফোনের আলোতে চলছে উদ্ধারকাজ। ফায়ার সার্ভিস ও সেনাসদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও নেমে পড়েছেন উদ্ধার অভিযানে। ভারী কোনো সরঞ্জাম না থাকায় অনেককে খালি হাতেই কংক্রিটের চাঁই সরাতে দেখা গেছে।

উপকূলীয় শহর লা গুয়ারার বাসিন্দা হুয়ান অর্তিজ জানান, তাঁর এক বন্ধু মারা গেছেন এবং আরেকজন এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা। তাঁর চেনা-জানা অন্তত ২০ জনের কোনো খোঁজ নেই। তবে কারাকাসের চাকাও পৌরসভার মেয়র গুস্তাভো দুকে আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, "আমাদের উদ্ধারকর্মীরা বিশ্বাস করেন, অনেকেই এখনো জীবিত আছেন। আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।"

খোলা আকাশের নিচে লাখো মানুষ, দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৯৮০ জন আহত হয়েছেন। হাসপাতাল, রেডক্রস ভবন ও ফরাসি দূতাবাসসহ অন্তত ২৫০টি বহুতল ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

বাড়িঘর হারিয়ে লাখ লাখ মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে, রাস্তায় দিন কাটাচ্ছেন। উপকূলীয় মোরন ও লা গুয়াইরা শহরে বিদ্যুৎ ও পানের জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই কঠিন সময়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা। খাবার, পানি ও ওষুধ নিয়ে তাঁরা ছুটে যাচ্ছেন মানুষের দুয়ারে। এমনকি রাজপথের আলোচিত সরকারপন্থী মোটরসাইকেল বাহিনী ‘কোলেকতিভো’-এর সদস্যদেরও এবার উদ্ধারকাজে অংশ নিতে দেখা গেছে।

বিশ্বজুড়ে সহায়তার হাত, পাশে দাঁড়িয়েছে জাতিসংঘ
ভেনেজুয়েলার এই চরম মানবিক বিপর্যয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। চিলির বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল ‘ইউএসএআর’ (USAR) ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর একটি অগ্রবর্তী দল উদ্ধারকাজে অংশ নিতে কারাকাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ গভীর শোক প্রকাশ করে দ্রুত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন এবং ১৫ কোটি ডলারের জরুরি তহবিল ঘোষণা করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, খুব দ্রুতই তাঁদের উদ্ধারকারী ও চিকিৎসা দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাবে। এছাড়া রাশিয়া, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, এল সালভাদর ও কাতার এই দুর্যোগে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার আন্তর্জাতিক উদ্ধারকাজ সমন্বয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি জানান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির কারণে ভূমিকম্পের আগেই ভেনেজুয়েলার প্রায় ৮০ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই নতুন বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে বিশ্বের সমস্ত দেশকে একযোগে বড় ধরনের সমন্বিত সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।