বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রথম বিদেশ সফরে বের হয়েছেন তারেক রহমান। রোববার (২১ জুন) তিনি মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। সেখান থেকে তার সরাসরি চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। নতুন সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে প্রতিবেশী ভারতকে বেছে না নিয়ে মালয়েশিয়া ও চীনকে নির্বাচিত করায় আঞ্চলিক রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে ব্যাপক তোলপাড়; বিশেষ করে ভারতীয় গণমাধ্যম ও নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে এটি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
দিল্লির উদ্বেগ ও ‘ভারত এড়ানোর’ সমীকরণ
ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধানেরা তাদের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে নয়াদিল্লিকে বেছে নিতেন, যা দুই দেশের মধ্যকার গভীর ও কৌশলগত সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে ধরা হতো। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে যে দৃশ্যমান টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, এই সফর যেন তারই বাস্তব প্রতিফলন।
ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য হিন্দু এবং হিন্দুস্তান টাইমস তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, প্রথম সফরেই ভারতকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, ঢাকার নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে অগ্রাধিকারের তালিকায় বড় ধরনের রদবদল এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের ঐতিহ্যগত প্রভাব বলয় সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কায় ভারতীয় কৌশলগত মহল এই সফরকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বেইজিংয়ের অবস্থান: ‘ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়’
ভারতীয় মহলে উদ্বেগ তৈরি হলেও বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছে বেইজিং। চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক চিয়ান ফেং দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস-কে জানিয়েছেন, ভারতের কৌশলগত মহল এখনো পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে নিজেদের একচ্ছত্র নেতৃত্বাধীন অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে তারা তাকে নিজেদের প্রভাব হ্রাসের ঝুঁকি হিসেবে দেখে।
তবে চীনা বিশ্লেষকদের দাবি, ঢাকা ও বেইজিংয়ের এই দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং একে কেবলই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চোখে দেখা সংকীর্ণতার বহিঃপ্রকাশ।
মূল লক্ষ্য যেখানে: অর্থনীতি ও জনশক্তি
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই সফরকে সম্পূর্ণ 'অর্থনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ' হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। শনিবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম সফরের মূল রূপরেখা তুলে ধরেন।
মালয়েশিয়া মিশন: রোববার থেকে সোমবার পর্যন্ত কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। এই বৈঠকের মূল এজেন্ডা হলো— মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং বড় আকারে নতুন কর্মী নিয়োগের বিষয়ে দেশটির সরকারকে অনুরোধ জানানো।
চীন মিশন: সোমবার রাতে মালয়েশিয়া থেকে পাঁচ দিনের সফরে চীন পৌঁছাবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সরকারি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, বেইজিং সফরে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য থাকবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রকল্পভিত্তিক চীনা অর্থায়ন ও নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
মুক্ত প্রভাত পর্যবেক্ষণ:
ঢাকার এই কূটনৈতিক চাল স্পষ্ট করে দেয় যে, নতুন প্রশাসন আবেগ বা ঐতিহ্যের চেয়ে বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক কূটনীতিকে (Economic Diplomacy) বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ভারতের সাথে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের এই নাজুক সময়ে চীন ও মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন ভারসাম্য ও মেরুকরণের সূচনা করতে যাচ্ছে।