লন্ডনের ব্যস্ত ও যান্ত্রিক নগরজীবনের মাঝেও এক চিলতে নোয়াখালী কিংবা ফেনীর গ্রামীণ আমেজ। ছুটির দিনে কিংবা ঈদের সকালে যেখানে ঘরে ঘরে সুবাস ছড়ায় ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পুলি, বিরিয়ানি আর হরেক পদের ভর্তা। প্রবাসের মাটিতে দাঁড়িয়েও নতুন প্রজন্ম ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলতে শেখে, আর প্রবীণেরা মেতে ওঠেন ফেলে আসা শৈশবের স্মৃতিচারণে। লন্ডনের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এক যৌথ পরিবারের ৪৩ সদস্যের গল্প এটি, যারা যান্ত্রিকতার দেশেও টিকিয়ে রেখেছেন বাঙালি সংস্কৃতির শেকড়।
ফেনীর দাগনভূঞা ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের মাটির সন্তান প্রয়াত গোলাম রহমান ওরফে রহমান সাহেবের পরিবার আজ যুক্তরাজ্যে গড়ে তুলেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একই পরিবারের এত বিপুলসংখ্যক সদস্য একসঙ্গে প্রবাসে থেকেও পারিবারিক বন্ধন ধরে রাখায় স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও পরিবারটি নিয়ে বেশ চর্চা রয়েছে।
এক প্রবাসীর স্বপ্ন ও শেকড়ের গল্প
আজ থেকে ৭১ বছর আগে, ১৯৫৫ সালে জীবিকার তাগিদে তরুণ গোলাম রহমান পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর লন্ডনে। তখন সেখানে বাঙালি কমিউনিটি ছিল নগণ্য, যাপন ছিল কঠোর সংগ্রামের। তবে সেই বৈরী পরিবেশেও তিনি স্বপ্ন বুনেছিলেন এক সোনালী ভবিষ্যতের। ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করেন রহমান সাহেব। আর এই নাগরিকত্বই পরবর্তী সময়ে বদলে দেয় তাঁর পুরো বংশের ভাগ্যরেখা।
লন্ডনে থিতু হলেও দেশের মাটির প্রতি টান কোনোদিন কমেনি তাঁর। ১৯৬৯ সালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সিরাজপুর ইউনিয়নের বিরাহীমপুর গ্রামে নতুন বসতি গড়েন তিনি। শিক্ষানুরাগী ও দানশীল এই মানুষটি এলাকার উন্নয়নে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজের সম্পদ। বিরাহীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৪৯ শতক, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণে ৫ শতক এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে রহমানিয়া জামে মসজিদের জন্য ৭৫ শতক জমি দান করেন তিনি। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ গ্রামের বাড়িতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই গুণী মানুষটি।
ভাই-বোনদের হাত ধরে ৪৩ সদস্যের বসতি
২০০৪ সালে রহমান সাহেবের মেজো ছেলে গোলাম মাহমুদ ও ছোট ছেলে আব্দুল কুদ্দুছ সুমন প্রথম লন্ডনে গিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। এর দুই বছর পর, ২০০৬ সালে তাঁর চার মেয়ে—আশরাফের নেছা রুবি, শামসুর নাহার মিনা, নূর নাহার রিনা ও নূরজাহান রুনা একসঙ্গে পাড়ি জমান লন্ডনে।
ধীরে ধীরে চার বোনের পরিবারের যথাক্রমে ১৮, ৭, ৭ জন এবং মেজো ও ছোট ভাইয়ের পরিবারের ৬ ও ৪ জন সদস্যসহ মোট ৪৩ জন সেখানে স্থায়ী হন। সন্তানদের এই বিশাল কাফেলার সঙ্গে লন্ডনেই ছায়া হয়ে আছেন মা মমতাজ বেগমও। বর্তমানে এই পরিবারের প্রায় ৩৮ জন সদস্যই ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। নতুন প্রজন্মের অনেকেই সেখানে জন্ম নিয়েছেন, কেউ সেখানে বিয়ে করে সংসার পেতেছেন, আবার অনেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে নামী প্রতিষ্ঠানে চাকরি বা পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
প্রবাসে থেকেও মরে যায়নি 'বাঙালিয়ানা'
পরিবারের সদস্যরা লন্ডনের আলাদা আলাদা বাসায় থাকলেও ঈদ, বিয়ে কিংবা যেকোনো পারিবারিক উৎসবে সবাই এক ছাদের নিচে জড়ো হন। তখন পুরো পরিবেশটাই যেন হয়ে ওঠে এক মিনি বাংলাদেশ।
লন্ডন প্রবাসী মেয়ে আশরাফের নেছা রুবি বলেন, "আমাদের বাবা সবসময় চাইতেন পুরো পরিবার যেন একসঙ্গে থাকে। প্রবাসের মাটিতে থেকেও আমরা বাবার সেই শেষ ইচ্ছা এবং পারিবারিক বন্ধনটা ধরে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আজ আমাদের এত বড় পরিবার এখানে প্রতিষ্ঠিত, এটা ভাবলেই আনন্দ হয়।"
আরেক মেয়ে নূরজাহান রুনা বলেন, "আমরা আমাদের সন্তানদের বিলাতি সংস্কৃতির মাঝেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি শেখানোর চেষ্টা করি। আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম যেন তাদের শেকড়কে ভুলে না যায়।"
লন্ডনে বার ট্রেনিং কোর্সের শিক্ষানবিশ আইনজীবী কাজী ইমদাদুল হক তানিম জানান, এই পরিবারটি শুধু লন্ডনেই নিজেদের ঐক্য ধরে রাখেনি, বরং নিয়মিত দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। স্বজনদের পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজেও আর্থিক সহযোগিতা পাঠান তারা।
যান্ত্রিক প্রবাস জীবনে যখন রক্তের সম্পর্কগুলোও দূরে সরে যায়, তখন রহমান সাহেবের পরিবার প্রমাণ করেছে—ইচ্ছে আর সংস্কৃতির টান থাকলে লন্ডনের বুকেও বাঁচিয়ে রাখা যায় এক টুকরো লাল-সবুজ বাংলাদেশ।