স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিল রেখে নামকরণ করা বগুড়ার নবগঠিত দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিতর্ক এড়াতে এবং জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী এই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে মৌখিকভাবে নাম পরিবর্তনের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত দাপ্তরিক চিঠি জেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়নি।
জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ফোন করে নামগুলো পরিবর্তন করার জন্য বলেছেন। মৌখিক নির্দেশনা পেয়েই আমরা প্রাথমিক কাজ শুরু করছি। আশা করছি, দু-এক দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে লিখিত চিঠি চলে আসবে।’
লিখিত নির্দেশনা আসার পর পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ কী হবে—এমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক জানান, বিতর্কিত ওই ইউনিয়নগুলোতে আবার নতুন করে গণশুনানি করা হবে। তিনি বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নতুন করে গণশুনানির তারিখ ঘোষণা করবেন। সেখানে স্থানীয় জনগণ উপস্থিত হয়ে মীরবাড়ী, সীমান্ত বা দিগন্তের পরিবর্তে যে নামগুলো প্রস্তাব করবেন, সবার মতামতের ভিত্তিতে সেই নামগুলোই চূড়ান্ত করা হবে।’
যেভাবে বিতর্কের সূত্রপাত
এর আগে গত ১১ জুন বগুড়ার জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষর করা এক প্রজ্ঞাপনে শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মধ্যে শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন গঠিত ইউনিয়নের নাম রাখা হয় ‘মীরবাড়ী’। আর মোকামতলা উপজেলায় গঠিত তিনটি ইউনিয়নের নাম দেওয়া হয় ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’।
প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই নামকরণের এই প্যানেল নিয়ে স্থানীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ির নাম ‘মীরবাড়ী’ অনুসরণে একটি এবং তাঁর বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত ও ছোট ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামানুসারে ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোতে এভাবে পরিবারের ছাপ রাখার বিষয়টি নিয়ে খোদ জাতীয় সংসদেও ক্ষোভ ও প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দলীয় এমপিরা।
প্রতিমন্ত্রীর দাবি বনাম প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত
বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চললেও গত সপ্তাহে সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিলেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি দাবি করেন, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন যথাযথ যাচাই-বাছাই ও গণশুনানির মাধ্যমেই এই নামগুলো নির্ধারণ করেছে। নামকরণ প্রক্রিয়ায় তাঁর কোনো ব্যক্তিগত প্রভাব ছিল না।
প্রতিমন্ত্রী সংসদে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, সৈয়দপুর ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট এলাকাটি গাবতলী ও সোনাতলা উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় সেটির নাম ‘সীমান্ত’ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, অন্য একটি এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান ও উন্মুক্ত আকাশ বিবেচনা করে ‘দিগন্ত’ নাম দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দুই ছেলের নামের সঙ্গে ইউনিয়ন দুটির নাম মিলে যাওয়াকে তিনি স্রেফ ‘কাকতালীয়’ বলে দাবি করেছিলেন।
তবে প্রতিমন্ত্রীর এই ‘ভৌগোলিক ও কাকতালীয়’ ব্যাখ্যায় ক্ষোভ কমেনি জনমনে। বিষয়টি নিয়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অস্বস্তি দূর করতেই শেষ পর্যন্ত সরকারপ্রধান নিজেই হস্তবক্ষেপ করলেন।
আজ রাতে বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেলা প্রশাসকের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, বিতর্ক এড়াতে মোকামতলা ও শিবগঞ্জের নবগঠিত ইউনিয়নগুলোর নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পুনরায় গণশুনানি শেষে নতুন নাম চূড়ান্ত হলে তা দ্রুতই গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।