দানিলো যখন গল্পটা বলছিলেন, নিউ জার্সির মরিসটাউনের আকাশ তখন মেঘলা। বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। কিন্তু ব্রাজিলের এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারের মনের ভেতর হয়তো চলছিল অন্য এক ঝড়। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি হঠাৎ টেনে আনলেন দূর প্রাচ্যের এক গল্প—চীনা বাঁশের গল্প।
বীজ বোনার পর প্রথম চার বছর মাটির ওপরে কোনো চিহ্ন দেখা যায় না। শুধু নিয়ম করে জল ঢালতে হয়, বিশ্বাস রাখতে হয়। পঞ্চম বছরে গিয়ে হঠাৎ মাথা তোলে সেই বাঁশ। আর তারপর মাত্র ছয় সপ্তাহে আকাশ ছুঁয়ে ফেলে—নব্বই ফুট! দানিলো প্রশ্ন রাখলেন, ‘তাহলে কি বাঁশটা মাত্র ছয় সপ্তাহে বাড়ল?’ নিজেই উত্তর দিলেন, ‘না। চার বছর ধরে সে মাটির নিচে নিঃশব্দে শিকড় ছড়িয়েছে। সেই শিকড়ই তাকে ঝড়ে ভেঙে পড়তে দেয় না।’
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বর্তমান অবস্থার এর চেয়ে জুতসই রূপক আর কী হতে পারে! মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্রয়ের পর সেলেসাওদের অন্দরমহলে এখন অস্বস্তি, বাইরে কড়া সমালোচনা। আর এই চাপের মুখেই বাংলাদেশ সময় আগামীকাল শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টায় ফিলাডেলফিয়ায় হাইতির মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল। গ্রুপ ‘সি’র শীর্ষে ওঠার লড়াইয়ে এই ম্যাচে জয়ের কোনো বিকল্প নেই কার্লো আনচেলত্তির দলের। কিন্তু ম্যাচ ছাপিয়ে বড় প্রশ্ন—মাটির নিচে ব্রাজিলের সেই অদৃশ্য শিকড় কি আদৌ গজিয়েছে?
সুরহীন অর্কেস্ট্রা ও নেইমার-শূন্যতা
বিশ্ব ফুটবলে হলুদ-সবুজ জার্সি মানেই এক জাদুকরী বিশ্বাস। পেলে-গারিঞ্চা কিংবা রোনালদো-রোনালদিনহোরা যে সৌন্দর্যের বীজ বুনেছিলেন, বর্তমানের ব্রাজিল দল যেন তার চেয়ে আলোকবর্ষ দূরে। ৩৩ বছর বয়সী দানিলোর কণ্ঠেও ঝরল সেই নির্মম বাস্তবতা, ‘আর্জেন্টিনা বা ফ্রান্সের মতো পরিপক্বতা আমাদের এখনো আসেনি।’ চার বছরে একাধিক কোচ বদল, প্রতিটা আন্তর্জাতিক বিরতিতে নতুন মুখের আগমন—শিকড় গজানোর ফুসরত মিলবে কোথায়?
ইতালিয়ান কিংবদন্তি আনচেলত্তি ক্লাব ফুটবলের রাজা হতে পারেন, কিন্তু জাতীয় দলের ডাগআউটে এক বছর কাটিয়েও এখনো একাদশ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হচ্ছে তাঁকে। মরক্কোর বিপক্ষে গত ম্যাচের ১-১ ড্র র্যাঙ্কিংয়ের বিচারে হয়তো মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু মাঠে ব্রাজিলের খেলা দেখে মনে হয়েছে এক সুরহীন অর্কেস্ট্রা—দলটা রিহার্সাল করছে ঠিকই, কিন্তু সুর মিলছে না।
এরই মধ্যে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে নেইমারের অনুপস্থিতি। গত পরশু অনুশীলনে বল নিয়ে দৌড়ালেও, ডান পায়ের কাফ মাসলের চোটের কারণে হাইতির বিপক্ষে বেঞ্চেই বসতে হচ্ছে তাকে। নেইমার না থাকা মানে ভিনিসিয়ুস বা রাফিনিয়াদের জন্য জায়গা তৈরি হওয়াটা কঠিন হয়ে যাওয়া। দানিলোর ভাষায়, ‘নেইমার মাঠে থাকা মানেই প্রতিপক্ষের ছক এলোমেলো হয়ে যাওয়া।’ কিন্তু বাস্তবতা নির্মম—শনিবারের সকালে মাঠের ডাগআউটে একাকী বসে থাকতে হবে নেইমারকে, যেখানে মিশে থাকবে এক দেশের প্রত্যাশা আর এক ক্লান্ত শরীরের সীমাবদ্ধতা।
এনদ্রিক-ঝলক ও নতুন পরিচয়ের খোঁজে
আগামীকালের ম্যাচে ব্রাজিলের একাদশে কিছু পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রজার ইবানিয়েজের জায়গায় রাইট ব্যাকে ফিরতে পারেন দানিলো নিজে। সেন্টার ব্যাকে মার্কিনহোসের সঙ্গী গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস হলেও তাঁর ঊরুর চোট নিয়ে কিছুটা সংশয় আছে। পায়ের ফোসকার কারণে সতর্কতায় আছেন রাফিনিয়াও।
তবে ফিলাডেলফিয়ার গ্যালারি যার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, তিনি ১৯ বছর বয়সী বিস্ময়বালক এনদ্রিক। অনুশীলনে মাতেউস কুনিয়া ও ইগর থিয়াগোর সঙ্গে পালা করে খেলেছেন তিনি। তাঁর একেকটা বুলেট গতির শট সামলাতে গোলকিপারদের যেভাবে গলদঘর্ম হতে হয়েছে, তাতে ম্যাচের একটা অংশে এনদ্রিকের মাঠে নামাটা প্রায় নিশ্চিত।
হাইতির বিপক্ষে ৩ পয়েন্ট পাওয়াটা ব্রাজিলের জন্য খুব বড় সমীকরণ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু প্রশ্নটা শুধু জয়ের নয়, প্রশ্নটা পরিচয়ের। সাম্বা ফুটবলের যে ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে, এই বিশ্বকাপ চক্রে এসে তাকে পুনরুত্থিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ।
শনিবার ভোরে ফিলাডেলফিয়ার মাঠে যখন বল গড়াবে, তখন কোটি ভক্তের চোখ থাকবে একটাই প্রশ্নের উত্তরে—চীনা বাঁশের সেই শিকড় কি প্রস্তুত? আকাশ ছোঁয়ার যাত্রাটা কি শুরু হবে কাল?