১৮ জুন, ২০২৬

চুক্তির পরও কাটেনি সংশয়, থমকে আছে হরমুজ প্রণালি

চুক্তির পরও কাটেনি সংশয়, থমকে আছে হরমুজ প্রণালি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত আগ্রাসনের জবাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। এর ফলে বিশ্বজুড়ে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর জ্বালানিসংকট দেখা দেয়। সেই সংকটের অবসান ঘটাতে অবশেষে এক টেবিলে বসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। গতকাল বুধবার ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে দুই নেতার উপস্থিতিতে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

চুক্তির পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘বিশ্বের সব জাহাজ, ইঞ্জিন চালু করো। তেল প্রবাহ আবার শুরু হোক।’ এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করলেও, মাঠের বাস্তবতা কিন্তু এখনো ভিন্ন।

চুক্তির তিন দিন পার হলেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। এখনো সাগরের দুই প্রান্তে আটকে আছে সাড়ে পাঁচশরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ।

কাগজে-কলমে চুক্তি, সাগরে এখনো সতর্কতা
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘মেরিন ট্রাফিক’ জানিয়েছে, চুক্তির ঘোষণা আসার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র সাতটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যার কয়েকটি ছিল ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার। দুই মাসের মধ্যে এটাই ছিল ইরানের প্রথম অপরিশোধিত তেল রপ্তানি।

যুদ্ধ শুরুর আগে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত, যার অর্ধেকই ছিল তেলবাহী ট্যাংকার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শিপিং ও সামুদ্রিক বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো চরম সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত তারা বড় কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।

জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ার ৩ প্রধান কারণ
১. পানির নিচের মাইন আতঙ্ক:

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো পানির নিচে মাইন পাতা থাকার আশঙ্কা। যদিও ইরান মাইনমুক্ত নিরাপদ পথের একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে, কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমার বড় অংশে মাইন পেতে রেখেছে তেহরান। জিসকে ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ ইকুইটি বিশ্লেষক হায়দার আনজুম বলেন,

"মাইনমুক্ত একটি নিরাপদ করিডর চিহ্নিত করতে এবং মাইন অপসারণের কাজ শেষ করতে প্রায় দুই মাস সময় লেগে যেতে পারে।"

২. বিমা খরচের আকাশচুম্বী হার:

যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের জন্য যুদ্ধঝুঁকিসংক্রান্ত বিমার কিস্তি ছিল জাহাজের মূল্যের প্রায় ০.২৫%। যুদ্ধ চলাকালে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ৫% এ পৌঁছায়। চুক্তির পর এই হার কিছুটা কমলেও তা এখনো ১ থেকে ৩ শতাংশের ঘরে আটকে আছে, যা সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। বিমা জটিলতা দূর না হলে কোম্পানিগুলো জাহাজ ছাড়তে চাইছে না।

৩. ইরানের নতুন 'তদারকি ফি' বা টোল নীতি:

ঐতিহাসিকভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের জন্য কোনো ফি দিতে হতো না। তবে এবার তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, আগের নিয়ম আর থাকছে না। নিরাপদ যাতায়াত সমন্বয়ের নামে তারা ফি আদায়ের জন্য 'পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ' গঠন করেছে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ নাদের হাবিবি মনে করেন, দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও জিসিসিভুক্ত দেশগুলো এই টোল মানবে না, যা নতুন করে সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।

'ইতিহাস' বনাম ভবিষ্যৎ
আগামীকাল শুক্রবার দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু রাজনৈতিক সমঝোতাই হরমুজ প্রণালিকে সচল করার জন্য যথেষ্ট নয়। সমুদ্রপথে পুরোপুরি নিরাপত্তা ফিরে আসতে এবং বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা অর্জন করতে আরও অন্তত চার মাস সময় লেগে যেতে পারে। ফলে ট্রাম্পের উদাত্ত আহ্বানের পরও বিশ্ব জ্বালানি বাজারের পূর্ণাঙ্গ স্বস্তি পেতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।