১৮ জুন, ২০২৬

সময়ের আড়ালে হারানো রাজা: রোনালদোর ছায়ামূর্তি ও এক বিষাদময় প্রস্থান

সময়ের আড়ালে হারানো রাজা: রোনালদোর ছায়ামূর্তি ও এক বিষাদময় প্রস্থান

সময়ের চাকা কি তবে থমকে গেছে, নাকি নির্মম এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আধুনিক ফুটবলের এক মহাকাব্যিক চরিত্র? আমেরিকার হিউস্টনে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটি কেবলই একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ ছিল না; এটি ছিল এক সময়ের অপ্রতিরোধ্য এক রাজার সাধারণ মানুষে পরিণত হওয়ার এক বিষাদময় দলিল।

৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মাঠে ছিলেন পুরো ৯০ মিনিট। কিন্তু মাঠের সেই চেনা গতি, সেই অতিমানবীয় লাফ, কিংবা প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগকে কাঁপিয়ে দেওয়া সেই চেনা রূপ—তার কিছুই দেখা যায়নি হিউস্টনের স্টেডিয়ামে। তাত্ত্বিকভাবে তিনি মাঠে রক্তমাংসের ফুটবলার হিসেবে উপস্থিত থাকলেও, বাস্তবে যেন ছিলেন নিজেরই এক চেনা ছায়ামূর্তি।

মোহের বৃত্ত ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা
আসলে একে কি রোনালদোর একক দোষ বলা চলে? চারপাশের আবহ যখন প্রতিনিয়ত কাউকে বোঝাতে থাকে যে তিনি এখনো আগের মতোই অনন্য, তখন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। গ্যালারিতে যখন ভক্তের ব্যানারে লেখা থাকে—‘বিশ্বকাপ থাক বা না থাক, আপনিই আমার সর্বকালের সেরা’—তখন নিজের অপরিহার্যতা বিশ্বাস করাই স্বাভাবিক মনস্তত্ত্ব। সামনে ঝুলছে ক্যারিয়ারের ১ হাজার গোলের সম্মোহনী মাইলফলক। এমন মুহূর্তে বিদায় বলাটা যেকোনো কিংবদন্তির জন্যই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ।

মাঠের নির্মম বাস্তবতা
ম্যাচে রোনালদো কোনো বড় ভুল বা হাস্যকর শট নেননি। কিন্তু রূঢ় সত্য হলো, তিনি খেলার ভেতরেই ছিলেন না। বিরতির পর গোললাইনের কাছ থেকে দুটি সুযোগ পেলেও তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। সাবেক ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরি ফক্স স্পোর্টসের বিশ্লেষণে স্পষ্ট করেই বলেছেন,

"দলের গোল প্রয়োজন, সেটা তোমারই (রোনালদোর) করতে হবে এমন নয়। সে যদি জায়গা ছেড়ে দিত, তবে ব্রুনো ফার্নান্দেস আরও ভালো অবস্থানে থেকে গোল করতে পারত।"

সবচেয়ে প্রতীকী দৃশ্যটি দেখা যায় ম্যাচের শেষের দিকে। ডান দিক থেকে আসা এক দুর্দান্ত ক্রসে যেখানে একসময় রোনালদো বাতাসে ভেসে উঠে হেড করতেন, সেখানে এবার তিনি লাফানোর চেষ্টাই করলেন না। কঙ্গোর ডিফেন্ডার শানসেল এমবেম্বা খুব সহজেই বলটি ক্লিয়ার করে দেন।

এমনকি প্রতিপক্ষ কঙ্গোর তরুণ মিডফিল্ডার এনগালায়েল মুকাউ ম্যাচ শেষে অকপটে বলেন,

"আমরা জানতাম সে আগের মতো নেই, তাই কম দৌড়াবে। তার বয়স হয়েছে, তবে তার বিপক্ষে খেলাটা সম্মানের।"

'ইতিহাস' বনাম বর্তমান
ম্যাচ শেষে পর্তুগিজ কোচ রবার্তো মার্তিনেজ রোনালদোকে পুরো সময় খেলানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেন, ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো অর্থ হয় না। কিন্তু কোচের অজান্তেই উচ্চারিত এই ‘ইতিহাস’ শব্দটিই আসলে রোনালদোর বর্তমানকে ফুটিয়ে তুলেছে—তিনি এখন শুধুই অতীত। বড় টুর্নামেন্টে এটি ছিল রোনালদোর টানা দশম ম্যাচ, যেখানে তিনি কোনো গোল পাননি।

যেদিন নরওয়ের আর্লিং হলান্ড, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে চোখধাঁধানো হ্যাটট্রিক করে মাঠ মাতাচ্ছেন, ঠিক সেদিন রোনালদোর এই নিষ্প্রভতা ফুটবল বিশ্বকে এক অদ্ভুত বিষাদে ডুবিয়েছে।

একাকী প্রস্থান
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর সতীর্থরা যখন মাঠে দর্শকদের অভিবাদনের জবাব দিচ্ছিলেন, রোনালদো তখন একা, ধীর পায়ে টানেলের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। কোনো ক্ষোভ বা নাটকীয়তা ছিল না তাঁর প্রস্থানোদ্দেশে, ছিল কেবল একাকীত্ব। সতীর্থদের ভিড়েও এই একাকী প্রস্থান যেন এক মহাকাব্যের বিষাদময় শেষের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিদায় বলার সঠিক সময় বেছে নিতে না পারার এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে রোনালদো কি পারবেন নিজের আবেগকে জয় করতে? উত্তরটা হয়তো সময়ই দেবে।