সময় কি সত্যিই সবকিছু গ্রাস করে নেয়? মহাকালের নিয়মে সবকিছুই একসময় ফুরিয়ে যায়—সাম্রাজ্য পতন হয়, যুগের বদল ঘটে, রূপকথারাও একসময় এসে থমকে দাঁড়ায় উপসংহারে। কিন্তু ফুটবলের সবুজ জমিনে এমন কিছু জাদুকর আসেন, যাঁরা ঘড়ির কাঁটাকে নিজের বুটের তলায় বন্দি করে রাখেন। সময় তাঁদের শেষ করতে পারে না, বরং তাঁদের স্পর্শে সময় নিজেই যেন আরও একটু দীর্ঘায়িত হতে চায়।
আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগের কথা। দিনটি ছিল ২০০৬ সালের ১১ অক্টোবর। জাগরেবের মাকসিমির স্টেডিয়ামে সেদিন গ্যারি নেভিলের অদ্ভুত এক ব্যাকপাস আর পল রবিনসনের অবিশ্বাস্য মিসের সুবাদে গোল পেয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। গ্যালারির বিজ্ঞাপনী বোর্ডে তখন ভাসছিল ল্যারি চার্লসের বিখ্যাত ব্ল্যাক কমেডি ‘বোরাত’-এর সেই হাস্যোজ্জ্বল উপহাস। সেই ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠে ৯০ মিনিট দাপিয়ে বেড়ানো এক রোগাটে তরুণকে হয়তো খুব বেশি চোখ দেখেনি। সেটি ছিল তাঁর মাত্র ১১তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
সেই বছরই আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভূমিষ্ঠ হওয়া সেই তরুণের নাম ছিল—লুকা মদরিচ। তখন টনি ব্লেয়ার ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে, আর্সেনাল সবে হাইবেরি ছেড়ে এমিরেটসে পা রেখেছে, ফেসবুক কেবল উন্মুক্ত হয়েছে সবার জন্য, আর টুইটার (বর্তমানে এক্স) নামক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটির বয়স মোটে তিন মাস!
আজ দুই দশক পেরিয়ে পৃথিবী বদলে গেছে সম্পূর্ণ। প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটেছে, রাজনীতির পটপরিবর্তন হয়েছে, মদরিচের সমসাময়িক শত শত ফুটবলার বুটজোড়া তুলে রেখে গ্যালারির দর্শক বনে গেছেন। কিন্তু ডালাসের মাঠে আজ যখন ক্রোয়েশিয়া মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ডের, তখন সেই চেনা ১০ নম্বর জার্সি গায়ে টানেলে দাঁড়িয়ে আছেন ৪০ বছর বয়সী এক ‘তরুণ’। খেলছেন নিজের ১৯৯তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ!
পুরোনো ওয়াইনের শেষ চুমুক:
ফুটবলের ব্যাকরণে ৪০ বছর বয়স মানেই বিদায়ী সংকলন, অবসরের বিষাদ কিংবা স্মৃতিকাতরতা। কিন্তু মদরিচের ক্ষেত্রে নিয়মটা খাটেনি। তিনি শুধু দলেই নেই, তিনি আছেন ক্রোয়েশিয়ার হৃদপিণ্ড হয়ে। পুরোনো ওয়াইন যেমন সময়ের সাথে সাথে আরও গাঢ়, আরও সুস্বাদু হয়; মদরিচও তেমনি বুড়িয়ে যাননি, গভীর হয়েছেন।
ক্রোয়েশিয়ার নকআউট পর্বের ইতিহাস মানেই যেন এক চরম নাটকীয়তা। তারা সাতটি ম্যাচ জিতেছে, কিন্তু একটিও নির্ধারিত ৯০ মিনিটে নয়। প্রতিবার অতিরিক্ত সময়, প্রতিবার টাইব্রেকারের স্নায়ুক্ষয়ী পরীক্ষা। অনেকে একে দুর্বলতা বলতে পারেন, কিন্তু এটাই মদরিচের ক্রোয়েশিয়ার আসল চরিত্র—তারা সহজে মরে না, সহজে হার মানে না। তারা সময়কে টেনেহিঁচড়ে নিজেদের ডেরায় নিয়ে আসে।
বোরাতের গোঁফের ছায়ায় যে মহাকাব্য শুরু হয়েছিল, ২০১৮ সালের মস্কোর সেই রূপালী রাত পেরিয়ে আজ ডালাসে এসে হয়তো তার শেষ পর্বের শুরু হচ্ছে। মদরিচ হয়তো এবারের বিশ্বকাপের পরেই তুলে রাখবেন বুটজোড়া। অফিসিয়ালি কিছু না বললেও বাতাস জুড়েই এখন বিদায়ের সুর।
ফুটবল মাঠে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য সেটাই, যখন ৪০ বছরের একজন মানুষ মাঠের বুক চিরে নিখুঁত এক পাস বাড়ান, চোখের ইশারায় প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে দেন এবং বুঝিয়ে দেন যে—মহাজাগতিক ঘড়ি তাঁর জন্য বাঁধা নিয়মে চলে না।
হয়তো পুরোনো ওয়াইনও একদিন ফুরিয়ে যায়। কিন্তু শেষ চুমুকের যে তীব্র ও মোহনীয় স্বাদ, তা আজীবন থেকে যায় জিভের ডগায়। ডালাসের তপ্ত মাঠ আজ সেই শেষ চুমুকের অপেক্ষাতেই বুঁদ হয়ে আছে। সময় হয়তো সবকিছু শেষ করে দেয়, কিন্তু লুকা মদরিচের মতো অমর চরিত্রদের সময় কেবল ইতিহাস থেকে কিংবদন্তিতে রূপান্তর করে।