১৬ জুন, ২০২৬

কেপ ফার্দের ডিফেন্স কেন ভাঙতে পারেনি শক্তিশালী স্পেন

কেপ ফার্দের ডিফেন্স কেন ভাঙতে পারেনি শক্তিশালী স্পেন

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে আজ ফুটবল বিশ্ব এক অলৌকিক রূপকথা প্রত্যক্ষ করল। একদিকে ছিল ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের ২ নম্বর দল, সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন; অন্যদিকে মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যার পুঁচকে দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে (র‍্যাঙ্কিং ৬৪)। মাঠের লড়াইয়ে স্প্যানিশরা নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাস্য ৮০১টি পাস খেলে আক্রমণের যে সুনামি বইয়ে দিয়েছিল, তা গোলশূন্য (০-০) ব্যবধানে রুখে দিয়েছে কেপ ভার্দে।

কিন্তু কীভাবে আলভারো মোরাতা, লামিনে ইয়ামাল আর নিকো উইলিয়ামসদের মতো বিশ্বমানের ফরোয়ার্ডদের বোতলবন্দি করে রাখল কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ? স্পেনের এই গোল খরা এবং কেপ ভার্দের অভেদ্য দেওয়াল হয়ে ওঠার মূল কৌশলগুলো বিশ্লেষণ করা হলো নিচে:

১. গোলপোস্টের নিচে ভোজিনিয়ার ‘লৌহমানব’ রূপ
স্পেনের জয় আর কেপ ভার্দের ড্রয়ের মধ্যে একমাত্র বড় ব্যবধান হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের ৩৬ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলকিপার ভোজিনিয়া। পুরো ম্যাচে স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডরা রক্ষণ ভেঙে যতবারই শট নিয়েছেন, ততবারই প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি। ম্যাচে এককভাবে ৭টি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে (Crucial Saves) স্পেনের জয়ের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দেন ভোজিনিয়া। তাঁর এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সই পুরো ডিফেন্সের আত্মবিশ্বাস কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

২. ‘লো-ব্লক’ ও কমপ্যাক্ট ডিফেন্সিভ লাইন
কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন মূলত দুই উইং দিয়ে গতি ও পাসের পসরা সাজিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে। কেপ ভার্দে এই শক্তিকে শুরুতেই নসাৎ করতে ‘লো-ব্লক’ (Low-block) কৌশল বেছে নেয়। তাদের চারজন ডিফেন্ডার নিজেদের ডি-বক্সের সামনে ঠাঁই দাঁড়িয়ে ডিফেন্সিভ লাইন এতটাই নিরেট রেখেছিলেন যে, স্পেনের মিডফিল্ডার পেদ্রি কিংবা রদ্রিদের পক্ষে ডিফেন্স চেরা কোনো পাস (Through Ball) দেওয়া সম্ভব হয়নি।

৩. উইং-ব্যাকদের দুর্দান্ত ট্র্যাকিং ও ডাবল-টিমিং
ইউরো মাতানো স্প্যানিশ উইঙ্গার লামিনে ইয়ামাল এবং নিকো উইলিয়ামসদের বোতলবন্দি করতে কেপ ভার্দে ‘ডাবল-টিমিং’ কৌশল ব্যবহার করে। যখনই ইয়ামাল বা উইলিয়ামস বল পেয়েছেন, তখনই কেপ ভার্দের ফুল-ব্যাকদের সহায়তায় উইঙ্গাররা নিচে নেমে এসে দুজনে মিলে তাদের ঘিরে ধরেছেন। ফলে স্পেনের দুই প্রান্তের গতিশীল আক্রমণগুলো বক্সের বাইরেই গতি হারিয়ে ফেলে।

৪. ৮০১ পাস বনাম পজিশনহীন ফুটবলের ধীরগতি
পুরো ম্যাচে স্পেন ৮০১টি পাস খেললেও তার সিংহভাগই ছিল অনুভূমিক (Horizontal Passes) এবং নিজেদের অর্ধের মধ্যে। কেপ ভার্দে মাঝমাঠের জায়গা এতটাই সংকুচিত করে রেখেছিল যে, স্পেন বল পজিশন ধরে রাখলেও ফাইনাল থার্ডে (প্রতিপক্ষের বক্সের আশেপাশে) গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে। ছক কষে স্পেনের পাসিং গেমকে বক্সের বাইরে রাখতে বাধ্য করে কেপ ভার্দের মিডফিল্ড।

অদম্য শারীরিক শক্তি ও ট্যাকটিক্যাল ফাউল
স্পেনের টেকনিক্যাল ফুটবলের বিপক্ষে কেপ ভার্দের আফ্রিকান ফুটবলাররা তাদের শারীরিক শক্তিকে (Physicality) শতভাগ কাজে লাগিয়েছেন। প্রতিবারই স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডরা বক্সে ঢোকার চেষ্টা করলে তারা ক্লিন ট্যাকল এবং কাউন্টার অ্যাটাক রুখতে কৌশলগত ফাউলের আশ্রয় নিয়েছেন, যা স্পেনের চেনা ছন্দকে বারবার ব্যাহত করেছে।

ম্যাচ শেষে স্পেনের কোচ ফুয়েন্তেও স্বীকার করেছেন, কেপ ভার্দের রক্ষণ ভাঙার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ তাঁরা তৈরি করতে পারেননি। স্পেনের এই অননুমেয় শুরু যেমন তাদের গ্রুপ পর্বের সমীকরণকে কঠিন করে তুলল, ঠিক তেমনি নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই ডিফেন্সের এক মাস্টারক্লাস দেখিয়ে বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখল ‘নীল হাঙররা’।