১৫ জুন, ২০২৬

চাঁদাবাজির অভিযোগই জোরালো: তদন্তে মিলল না জামায়াত নেতা নজরুল ইসলামের দাবির ভিত্তি

চাঁদাবাজির অভিযোগই জোরালো: তদন্তে মিলল না জামায়াত নেতা নজরুল ইসলামের দাবির ভিত্তি

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে চলমান উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কে নতুন মোড় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ তুলে কাজ বন্ধের আন্দোলন করে আসছিলেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য হাজী মো. নজরুল ইসলাম। তবে সরকারি উচ্চপর্যায়ের তদন্তে তার এই দাবির কোনো সত্যতা বা ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যে জমিকে চেয়ারম্যান নিজের লিজকৃত সম্পত্তি বলে দাবি করছিলেন, প্রকৃতপক্ষে সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি। এই প্রতিবেদনের পর সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, মূলত জমি সংক্রান্ত বিরোধ নয়, মোটা অঙ্কের চাঁদা না পেয়েই উন্নয়নমূলক এই প্রকল্পে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছিল।

তদন্তে যা মিলল: সরকারি জমিতেই সিসি ব্লক ইয়ার্ড
জাইকার অর্থায়নে শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ও কাশিমারী ইউনিয়নে প্রায় আড়াই কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ করছে মেসার্স আর-রাদ করপোরেশন। কাজ বন্ধের নানামুখী চেষ্টার পর পানি সম্পদ মন্ত্রীর নির্দেশে গত ১ জুন একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, প্রশাসন, বিএনপি-জামায়াত ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে চেয়ারম্যানের দাবির সত্যতা যাচাইয়ে একটি ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

৪ জুন সরেজমিন পরিদর্শন শেষে গত ৮ জুন জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়:

প্রকল্পের সিসি ব্লক কাস্টিং ইয়ার্ডটি যেখানে নির্মাণ করা হয়েছে, সেটি ‘বিআরএস দাগ ৭০০১ ও ৭০০২’ এর অন্তর্ভুক্ত, যা যথাক্রমে সরকারি খাস জমি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন।

চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম যে দাগ নম্বরের জমি নিজের লিজকৃত সম্পত্তি হিসেবে দাবি করেছিলেন, সেগুলোর অবস্থান প্রকল্পের ব্যবহৃত জমি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

তদন্তকালে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে হালনাগাদ কোনো বৈধ লিজ দলিলও উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি কোনো ইউপি চেয়ারম্যানের অনুকূলে উপজেলা খাস জমি বন্দোবস্ত কমিটি লিজ দিতে পারে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

নির্ধারিত ৫ কার্যদিবসের মধ্যে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। তবে তদন্তের সময় জামায়াতে ইসলামী ও চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকায় প্রতিবেদনে তাদের স্বাক্ষর নেই।

সামনে এল ১২ ও ১৫ লাখ টাকা চাঁদাবাজির তথ্য
তদন্ত প্রতিবেদনের পর প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের পুরোনো অভিযোগগুলো আরও জোরালো হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লিখিত অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রকল্প এলাকায় গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন এবং বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করেন। টাকা না দিলে প্রকল্প অফিস ভাঙচুর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার হুমকি দেওয়া হয়।

আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ আলী খান অভিযোগ করেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার কাছে প্রথমে ১২ লাখ টাকা কমিশন দাবি করা হয়েছিল। এরপর চাঁদা না পেয়ে শ্রমিকদের কাজ করতে বাধা দেওয়া হয় এবং সাব-ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখানো হয়।

ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজসহ মামলা
বিতর্ক চূড়ান্ত রূপ নেয় গত ২৫ মে, যখন শ্যামনগর থানায় চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও তার ছেলেসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১৯ মে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে চেয়ারম্যান ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। পরবর্তীতে ২৩ মে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে প্রকৌশলী জাহিদ হাসানকে মারধর এবং তার কাছ থেকে অ্যাপল স্মার্টওয়াচ ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই পুরো ঘটনার ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে বলে দাবি করেছে বাদীপক্ষ। মামলার পর থেকেই ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন।

অভিযোগ অস্বীকার ও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
অবশ্য নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করেছেন হাজী নজরুল ইসলাম। পলাতক থাকা অবস্থায় তার দাবি, তিনি মূলত সরকারি সামাজিক বনায়নের জমি রক্ষা এবং পরিবেশগত কারণে প্রকল্পের কিছু কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কোনো চাঁদা দাবি করেননি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর তীরবর্তী এই বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনপদকে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষার জন্য এই প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষার আগে কাজ শেষ না হলে পুরো এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়ত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক মহলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।