১৫ জুন, ২০২৬

ইউরোপের বন্দিশালা থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চ: আমাদ দিয়ালোর এক রূপকথার গল্প

ইউরোপের বন্দিশালা থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চ: আমাদ দিয়ালোর এক রূপকথার গল্প

পশ্চিম আফ্রিকার হাজারো তরুণের চোখে একটাই স্বপ্ন—ইউরোপের সবুজ ঘাসে ফুটবল পায়ে দৌড়ানো। কিন্তু এই স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম বাস্তবতা। প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার আফ্রিকান কিশোরকে ফুটবলার বানানোর মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হয় ইউরোপে। কেউ ধরা পড়ে বন্দি হন কারাগারে, কেউ বা বুকভরা হতাশা নিয়ে ফিরে আসেন শূন্য হাতে।

কিন্তু সবার গল্প এক হয় না। নিয়তি যার পায়ে গোলের জাদু লিখে রেখেছে, তাকে আটকায় কে? তিনি আমাদ দিয়ালো। আইভরিকোস্টের সেই লড়াকু তরুণ, যিনি সব অন্ধকার পেরিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে ইকুয়েডরের বিপক্ষে ইনজুরি টাইমে গোল করে মেতেছেন বুনো উল্লাসে।

আবিদজানের ধুলোবালি থেকে লিডার ফুট
আমাদ দিয়ালোর ফুটবলের হাতেখড়ি কোনো আধুনিক ইউরোপীয় একাডেমিতে হয়নি। তাঁর শৈশব কেটেছে আবিদজানের সবচেয়ে ব্যস্ত, কোলাহলপূর্ণ আর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ‘আজিদাম’-এ। যেখানে প্রতিটি দিনই ছিল বেঁচে থাকার এক নির্মম সংগ্রাম।

মাত্র আট-নয় বছর বয়সে স্কুলের ছুটির দিনে ধুলো উড়িয়ে খেলছিলেন আমাদ। তখনই তাঁর পায়ের জাদু আর প্রখর ফুটবল বুদ্ধি নজর কাড়ে স্থানীয় কোচ হামেদ মামাদু ত্রাওরের। ত্রাওরে তাকে নিয়ে আসেন নিজের ক্লাব ‘লিডার ফুট’-এ। ব্যস, সেখান থেকেই শুরু আইভরিকোস্টের এই বিস্ময় বালকের জয়যাত্রা।

স্বপ্নের ইউরোপ এবং ‘মানব পাচার’ বিতর্ক
২০১৫ সালে ফুটবলের টানেই ইতালিতে পাড়ি জমান দিয়ালো। কিন্তু ২০২০ সালের গ্রীষ্মে তাঁর জীবন নাটকীয় মোড় নেয়। ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় মানব পাচার কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে তাঁর নাম।

ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (এফআইজিসি) তদন্তে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। কোচ হামেদ মামাদু ত্রাওরে এবং তাঁর স্ত্রী মারিনা নিজেদের আমাদ ও আরেক ফুটবলার হামেদ জুনিয়র ত্রাওরের ভুয়া বাবা-মা সাজিয়ে, জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে তাদের ইতালিতে এনেছিলেন। এই সুপরিকল্পিত জালিয়াতির ফাঁদে পড়ে যেখানে অনেক তরুণের ক্যারিয়ার অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়, সেখানে আমাদ মাঠের লড়াইয়ে ছিলেন অবিচল।

ওল্ড ট্রাফোর্ডের কঠিন বাস্তবতায় পরিপক্বতা
ইতালিয়ান ক্লাব আতালান্তার হয়ে সিরি ‘আ’-তে অভিষেক ম্যাচেই গোল করে হইচই ফেলে দেন দিয়ালো। নজর কাড়েন ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের। ২০২১ সালে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল অঙ্কে ওল্ড ট্রাফোর্ডে থিতু হন তিনি।

তবে রেড ডেভিলসদের ডেরায় পথটা মসৃণ ছিল না। ওয়ান্ডারকিড তকমা পেলেও নিয়মিত খেলার সুযোগ মিলছিল না। ধারে খেলতে হয়েছে রেঞ্জার্স ও সান্ডারল্যান্ডে। কিন্তু এই কঠিন সময়টাই বদলে দেয় আমাদকে। তিনি বুঝতে শেখেন—শুধু প্রতিভা নয়, সাফল্যের জন্য প্রয়োজন চরম ধৈর্য। সেই ধৈর্যের ফল হিসেবেই আবারও ওল্ড ট্রাফোর্ডের মূল দলে জায়গা করে নেন তিনি।

২০২৬ বিশ্বকাপ: রূপকথার সেই অন্তিম মুহূর্ত
সব বাধা, বিতর্ক আর লড়াইয়ের শেষ পরিণতি যেন লেখা ছিল ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে। 'ই' গ্রুপের ম্যাচে ইকুয়েডরের মুখোমুখি আইভরিকোস্ট। ঘড়ির কাঁটা তখন ইনজুরি টাইমে, স্কোরবোর্ড বলছে ০-০। ম্যাচ যখন নিশ্চিত ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আমাদ দিয়ালো।

বক্সের ভেতর বল পেয়েই দারুণ এক মাপা শটে বল জড়ালেন প্রতিপক্ষের জালে। ১-০ গোলের ঐতিহাসিক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আইভরিকোস্ট।

যে ছেলের ফুটবল ক্যারিয়ার একসময় ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েছিল, আজ তিনিই পুরো আইভরিকোস্টকে ভাসালেন আনন্দের জোয়ারে। আমাদ দিয়ালো প্রমাণ করলেন—শত প্রতিকূলতার মাঝেও যদি লক্ষ্য ঠিক থাকে, তবে রূপকথা সত্যি করা অসম্ভব কিছু নয়।