শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন প্রায় ফাঁকা। আশাহত দর্শকেরা যখন বাড়ির পথ ধরেছেন, ঠিক তখনই মিরপুরের আকাশে রূপকথার এক প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত! শরীফুল ইসলামের পরপর দুই বলে দুই উইকেট শিকারের পর যেন থমকে গেল পুরো স্টেডিয়াম।
২৭৫ রানের লক্ষ্য তাড়ায় মাত্র ৯ রানের দূরত্বে থাকা অস্ট্রেলিয়ার ৭টি উইকেট হাওয়া। অসম্ভবকে সম্ভব করার যে বিশ্বাস শরীফুল জাগিয়ে তুলেছিলেন, তা এক মুহূর্তের জন্য হলেও কাঁপিয়ে দিয়েছিল অজি শিবিরকে। তবে শেষ মুহূর্তের চরম নাটকীয়তা আর ভাগ্যের ফেরে ম্যাচটি ১ উইকেটে হেরে হোয়াইটওয়াশের সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করল বাংলাদেশ।
অথচ ম্যাচের গল্পটা অনায়াসেই বাংলাদেশের হতে পারত। ৩০ বলে যখন অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ৯ রান, তখন মোস্তাফিজুর রহমান নিজের বলেই ক্যাচ হাতছাড়া করায় আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস নামে মিরপুরে। পরের ওভারে এসে আবার ত্রাতা হলেন শরীফুল; দুর্দান্ত এক উইকেট-মেডেন ওভারে মেহেদী হাসানের চোখধাঁধানো ক্যাচে সাজঘরে ফেরেন বেন ডোয়াশিস। ২ উইকেট দূরে থাকা বাংলাদেশের ম্যাচ জয়ের আশা যখন তুঙ্গে, তখনই আবার ক্যাচ মিসের মহড়া।
এবার তানজিদ হাসান ক্যাচ ফেললে ম্যাচ ঝুলে যায় সুতোয়। ২ ওভারে ৫ রান দরকার হলেও উইকেটে ছিলেন সেঞ্চুরিয়ান কুপার কনোলি। মোস্তাফিজের অফস্টাম্পের বাইরের বল টেনে স্টাম্পে এনে কনোলি (১৪৯) আউট হলে শেষ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার সমীকরণ দাঁড়ায় ৩ রান, হাতে ১ উইকেট। তাসকিন আহমেদের তৃতীয় বলে অ্যাডাম জাম্পার বাউন্ডারিতে শেষ পর্যন্ত মুঠো থেকে ম্যাচটি ফসকে যায় স্বাগতিকদের।
এর আগে টসে জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছিল বাংলাদেশ। দলীয় শূন্য রানেই প্যাভিলিয়নে ফেরেন সৌম্য সরকার। মাত্র ৬১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে যখন দল ধুঁকছিল, তখন হাল ধরেন তাওহিদ হৃদয় ও লিটন দাস। দুজনের ৯২ রানের জুটিতে ম্যাচে ফেরে বাংলাদেশ। তবে আর্দ্রতাজনিত কারণে পেশির টানে লিটন রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মাঠ ছাড়লে ধাক্কা খায় ইনিংস। এরপর দলের হাল ধরেন দলে ফেরা মোসাদ্দেক হোসেন।
৪ বছর পর ওয়ানডেতে ফেরা মোসাদ্দেক ৫১ বলে ৫৬ রানের একটি লড়াকু ইনিংস খেলেন। অন্যদিকে, ৮৮ বলে ৮৩ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে বিদায় নেন হৃদয়। ইনিংসের শেষদিকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আবার ব্যাটিংয়ে নামেন লিটন এবং দীর্ঘ ১১ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে মিরপুরের মাটিতে নিজের প্রথম ওয়ানডে ফিফটি তুলে নেন। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পুঁজি দাঁড়ায় ২৭৪ রান।
বল হাতে শুরুটা ভালো হয়নি বাংলাদেশের। আগের দুই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে শুরুতে চেপে ধরলেও, আজ প্রথম উইকেটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে পঞ্চম ওভার পর্যন্ত। তবে পঞ্চম ওভারে এসে জোড়া আঘাত হেনে প্রথম ব্রেক-থ্রু এনে দেন শরীফুলই। মাঝে সৌম্য সরকারের দুর্দান্ত ক্যাচ এবং মেহেদীর নিয়ন্ত্রিত বোলিং আশা বাঁচিয়ে রাখলেও অজি ওপেনার কুপার কনোলির অনবদ্য সেঞ্চুরি ম্যাচটি বাংলাদেশের নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল।
বিশেষ করে ৪৫তম ওভারে তাসকিনকে টানা তিন ছক্কা মেরে ম্যাচ প্রায় শেষ করে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ক্যারিয়ারের প্রথম ৫ উইকেট (সব মিলিয়ে ৬ উইকেট) শিকার করে শরীফুল ম্যাচটিতে যে রোমাঞ্চ এনে দিয়েছিলেন, তা বহুদিন মনে রাখবে ক্রিকেটপ্রেমীরা। শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস্য এক জয়ের স্বপ্ন জাগিয়েও আক্ষেপের হার নিয়েই মাঠ ছাড়তে হলো নাজমুল হোসেন শান্তর দলকে।