একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যখন নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, ঠিক তখনই ইরানের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে একটি সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া শর্ত প্রকাশ করার পরপরই ট্রাম্প একে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং তেহরানের সততা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন।
গত শুক্রবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, “লিখিতভাবে যেসব শর্তে সম্মতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে এর (প্রকাশিত খবরের) কোনোই সম্পর্ক নেই।” ইরানি কর্তৃপক্ষের তীব্র সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও যোগ করেন, “এরা চুক্তির ক্ষেত্রে চরম অসৎ। এদের সঙ্গে সৎ উদ্দেশ্যে কোনো চুক্তি করার সুযোগ নেই।”
চুক্তির খুব কাছে গিয়েও নড়বড়ে পরিস্থিতি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই যুদ্ধের একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের চেষ্টা হিসেবে গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছিলেন যে, একটি চুক্তি ‘অনুমোদন’ হয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হতে পারে।
একই সুর শোনা গিয়েছিল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির কণ্ঠেও। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামের একটি চুক্তি স্বাক্ষরের এত কাছাকাছি তাঁরা এর আগে কখনোই পৌঁছাননি। তবে শর্ত চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত গণমাধ্যমগুলোকে অনুমাননির্ভর খবর প্রকাশ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান আরাগচি। ট্রাম্প তাঁর পোস্টে আরাগচির এই বার্তার একটি স্ক্রিনশটও শেয়ার করেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের সর্বশেষ এই ক্ষুব্ধ বিবৃতি প্রমাণ করে, চুক্তির চূড়ান্ত অগ্রগতি এখনো বেশ নড়বড়ে ও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।
বিতর্ক উসকে দিল ইরানের ‘ইরনা’ নিউজ
ট্রাম্প তাঁর পোস্টে নির্দিষ্ট কোনো সংবাদমাধ্যমের নাম উল্লেখ না করলেও, ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ চুক্তির সাতটি ‘মূল শর্ত’ প্রকাশ করার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রতিক্রিয়া আসে।
এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধ সাময়িক বন্ধ রাখার একটি চুক্তি হলেও স্থায়ী চুক্তির ক্ষেত্রে মূল বিরোধের জায়গাগুলোতে ইরান কার্যত কোনো ছাড় দেয়নি বলে ‘ইরনা’র প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়:
পরমাণু কর্মসূচি: ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন কোনো মতৈক্য হয়নি। চুক্তি স্বাক্ষরের ৬০ দিন পর এ বিষয়ে নতুন আলোচনা শুরু হবে।
হরমুজ প্রণালি: এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার বিষয়ে ইরান একমত হয়নি, কেবল স্বাভাবিক চলাচল ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার বিষয়ে কাজ করবে।
লেবানন প্রসঙ্গ: লেবাননে ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসন ও হামলা বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তহবিল ও নিষেধাজ্ঞা: চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ইরানের জব্দ করা সম্পদের একটি অংশ ছাড় দেওয়া হবে এবং ক্ষতিপূরণ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে পরে আলোচনা হবে।
তহবিল ছাড়ের সম্ভাবনা নাকচ যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। শুক্রবার তিনি স্পষ্ট করে জানান, চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ইরানের কোনো তহবিল ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। চুক্তির অধীনে ইরান নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলেই কেবল এই তহবিল ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ভ্যান্স দৃঢ়তার সাথে বলেন, “প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) যেভাবে হোক আমাদের জন্য একটি ভালো ফলাফল নিয়ে আসবেন।”
উপসাগরীয় অঞ্চলের এই যুদ্ধ বন্ধের ঐতিহাসিক মুহূর্তটি যখন একদম দ্বারপ্রান্তে, তখন ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান ও দুই দেশের বিপরীতমুখী দাবি ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ বাস্তবায়নের পথে নতুন করে বড় ধাক্কা দিল।