বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে বেশি দিন সুযোগ দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে আয়োজিত ১১-দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বিএনপির উদ্দেশে বলেন, “সময় খুব সীমিত। সময় ফুরিয়ে আসছে। এই সময়ের মধ্যে পরিবর্তন না হলে পরিণতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে।” গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে এই বিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে সরকারের তীব্র সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, সরকারকে গণভোটের গণরায় মেনে নিতে হবে। অন্যথায় শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে, যখন আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করতে বাধ্য হয়েছিল। জনগণকে রাজপথে ঠেলে না দিয়ে ভালোয় ভালোয় জনদাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নেতা-কর্মীদের জেল বা ফাঁসির ভয় দেখিয়ে লাভ নেই উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে তাঁরা বারবার জীবন দিতে প্রস্তুত। ‘জেলের তালা বা চাবিওয়ালা’ কোনোটিই স্থায়ী নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
"প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে ভুল তথ্য বের হওয়া লজ্জাজনক"
দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে একজন ‘সর্ব বিষয় বিশারদ’ মন্ত্রী রয়েছেন, যিনি একাই সব মন্ত্রণালয় চালান। এমনকি কক্সবাজারে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, বিরোধী দল নাকি বাজেটে মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ট্যাক্স বাড়ানোর প্রতিবাদে মিছিল করেছে—যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভুয়া। শফিকুর রহমান বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর পদটি একটি রাষ্ট্রীয় পদ; তাঁর মুখ দিয়ে অনবরত এমন ভুল ও মিথ্যা তথ্য বের হওয়া জাতির জন্য লজ্জাজনক ও ক্ষতিকর।” তিনি আরও যোগ করেন, জাতীয় সংসদে কথা বলার পরিবেশ না পেয়েই তাঁরা জনগণের সংসদ অর্থাৎ রাজপথে চলে এসেছেন।
‘বাস্তবতা-বিবর্জিত বাজেট ও ব্যাংক দখল’
সমাবেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বর্তমান বাজেটকে ‘লুটপাটের বাজেট’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এই বাজেটে দুর্নীতি ও ব্যাংক দখল বন্ধ করার কোনো রাস্তা রাখা হয়নি। এটি বাস্তবায়ন করতে বিদেশ থেকে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিতে হবে।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বর্তমানে ব্যাংক দখল শুরু হয়েছে এবং ইসলামী ব্যাংককে আবারও এস আলমের হাতে তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এস আলমের গাড়িতে চড়ে কে সংবর্ধনা নিয়েছিলেন এবং কারা তাকে প্রোটেকশন দিচ্ছেন, তা দেশের মানুষ জানে। এছাড়া গতকাল চট্টগ্রামে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে পুলিশের মারধরের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশ সংস্কার না হওয়ায় জনগণের ওপর আবারও জুলুম শুরু হয়েছে। সরকার স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটলে জনগণ আবারও গণ-অভ্যুত্থানের পথ বেছে নেবে।
সীমান্ত হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, “কাঁটাতার আর বন্দুকের গুলি দিয়ে কোনো বন্ধুত্ব হয় না। বাংলাদেশে কোনো আধিপত্যবাদী শক্তি টিকে থাকবে না।” সমাবেশের সভাপতি ও এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, দেশের মানুষ আজ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। মা-বোনেরা ঘর থেকে বের হতে নিরাপদ বোধ করছেন না। চোর-ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা পেতে তিনি সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, আমার বাংলাদেশ পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম এবং ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদসহ শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।