১৩ জুন, ২০২৬

ক্রিকেটার নাঈমকে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারধর

ক্রিকেটার নাঈমকে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারধর

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের অতি-উৎসাহী ও হিংস্র আচরণে এবার খোদ জাতীয় দলের এক ক্রিকেটারকে চরম হেনস্তার শিকার হতে হলো। ঢাকা থেকে খেলা শেষে শান্তিতে ঘরে ফিরছিলেন জাতীয় ক্রিকেট দলের তারকা স্পিনার নাঈম হাসান। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছাতেই রাতের আঁধারে তাঁর ওপর নেমে আসে পুলিশের নির্মম নির্যাতন। লাঠি ও পাইপ দিয়ে পিটিয়ে, গলা টিপে ধরে একপ্রকার অপহরণের মতো করে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় থানায়।

গতকাল শুক্রবার রাতের এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় পুরো ক্রীড়াঙ্গনসহ দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র প্রতিবাদের মুখে ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং পুলিশের সোর্স সোহেলকে আটক করা হয়েছে।

এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামতেই নরককুণ্ড
নাঈম হাসান জানান, ঢাকা থেকে প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষ করে শুক্রবার রাতের ফ্লাইটে তিনি চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নামেন। সেখান থেকে একটি সিএনজি অটোরিকশা যোগে বহদ্দারহাটের ফরিদারপাড়ায় নিজ বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। গাড়িটি লালখান বাজার এলাকায় এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার পরপরই খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ সিএনজিটির গতি রোধ করে।

কোনো কিছু না বলেই চালকের কাছ থেকে গাড়ির কাগজপত্র কেড়ে নেয় পুলিশ। নাঈম হাসান নিজের পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা আমলে না নিয়ে তাঁকে গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নামানো হয়। এরপর এসআই শফিকুল ও পুলিশের সোর্স সোহেল পাইপ ও লাঠি দিয়ে জাতীয় দলের এই ক্রিকেটারকে নির্বিচারে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে জোরপূর্বক অন্য একটি অটোরিকশায় তোলার সময় তাঁর গলা চেপে ধরা হয়।

"সমর্থক ভাইরা না থাকলে অন্য কিছু হতে পারত"
আজ শনিবার বিকেলে নিজ বাসভবনে আয়োজিত এক আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনে নাঈম হাসান বলেন, “যখন সিএনজিতে তুলে ফেলে, তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম। আমি জানতাম না তারা আমার গলা চেপে ধরবে। তখন সেখানে ১০০ থেকে ১২০ জনের মতো সমর্থক ভাইরা জড়ো না হলে ঘটনাটি অন্য রকম হতে পারত।” তিনি আরও জানান, সাধারণ মানুষ ও সমর্থকেরা শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদই করেননি, রাতে নাঈমের সুরক্ষায় খুলশী থানা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে যান।

বিসিবি সভাপতির ফোন, ওসির ঔদ্ধত্য!
থানায় নিয়ে যাওয়ার পরও নাঈম হাসানের ওপর মানসিক নির্যাতন বন্ধ হয়নি। ঘটনা জানতে পেরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবাল তাৎক্ষণিকভাবে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ফোন করেন। নাঈম বলেন, “তামিম ভাই যখন ওসির সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন আমি কিছু বলতে চাইলে ওসি সাহেব আমাকে আঙুল উঁচিয়ে চুপ থাকতে বলেন।” একজন জাতীয় ক্রিকেটারের সঙ্গে ওসির এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে পুলিশের পেশাদারিত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। পরবর্তীতে বিসিবি কর্মকর্তাদের কঠোর হস্তক্ষেপে থানা থেকে মুক্তি পান নাঈম।

সিএমপির অ্যাকশন ও তদন্ত কমিটি
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এবং ক্রীড়ামোদীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে নড়েচড়ে বসে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। আজ দুপুরে নাঈমের বাসায় ছোটেন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। তিনি সাংবাদিকদের জানান, অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং সোর্স সোহেলকে আটক করা হয়েছে। পুরো ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নাঈম
সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত নাঈম হাসান এই অতর্কিত হামলায় শারীরিকভাবে আঘাত পাওয়ার পাশাপাশি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর কারও সাথে না ঘটে, তার ব্যবস্থা নিয়েছি। অন্তত ১০ জন মানুষের উপকার হবে।” সংবাদ সম্মেলনের শেষপর্যায়ে অশ্রুসিক্ত চোখে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে এই ক্রিকেটার বলেন, “আমি একটু একা থাকতে চাইছি।”

নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা পুলিশের এমন রূপ দেখে সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—জাতীয় দলের একজন সেলিব্রেটি ক্রিকেটারই যদি প্রকাশ্য রাস্তায় এভাবে নিগৃহীত হন, তবে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা কোথায়?