সংসার চালানোর শেষ সম্বলটুকুতেও এবার ভাগ বসাল নতুন বাজেট। মধ্যবিত্ত ও পেনশনভোগীদের আস্থার একমাত্র জায়গা ‘সঞ্চয়পত্র’ থেকে এখন আরও কম টাকা ঘরে ফিরবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থবিলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর অগ্রিম করের হার ৫ শতাংশ থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাতিল করা হয়েছে এতদিনের ‘চূড়ান্ত কর দায়’ সুবিধা। সরকারের এই টেকনিক্যাল মারপ্যাঁচে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।
হাতছাড়া হবে লাভের টাকা হিসাব কষে দেখা গেছে, সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত পরিবার সঞ্চয়পত্রে প্রতি এক লাখ টাকা বিনিয়োগে মাসে মোট মুনাফা আসে ৯৯৪ টাকা ১৭ পয়সা। আগে ৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখার পর গ্রাহক হাতে পেতেন প্রায় ৯৪৫ টাকা। এখন কর দ্বিগুণ হওয়ায় গ্রাহকের হাতে আসবে ৮৯৫ টাকারও কম। অর্থাৎ, প্রতি লাখ টাকায় সরাসরি ৫০ টাকা করে কম পাবেন মধ্যবিত্তরা। যারা সঞ্চয়পত্রের মাসিক মুনাফা দিয়ে প্রতি মাসের চাল-ডাল বা ওষুধের খরচ মেটাতেন, তাঁদের ওপর এই সিদ্ধান্ত এক বড় ধাক্কা।
উধাও ‘চূড়ান্ত কর দায়’, যুক্ত হলো রিফান্ডের জটিলতা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ১৬৩ ধারা সংশোধন করে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে সঞ্চয়পত্র থেকে যে কর কাটা হতো, সেটাই চূড়ান্ত ট্যাক্স হিসেবে গণ্য হতো, পরে আর কোনো হিসাব দিতে হতো না। এবার সেই নিয়ম তুলে দিয়ে একে 'অগ্রিম কর' করা হয়েছে। এনবিআরের দাবি, বছর শেষে রিটার্ন জমা দেওয়ার পর যদি দেখা যায় গ্রাহকের প্রদেয় করের চেয়ে অগ্রিম কর বেশি কাটা হয়েছে, তবে আবেদনের ১২০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত টাকা ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেওয়া হবে।
“দেশের মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা দিয়ে সংসার চালান। এখন মুনাফা থেকে আগের চেয়ে বেশি টাকা কেটে নিলে তাঁরা তীব্র আর্থিক চাপে পড়বেন। মধ্যবিত্তশ্রেণিকে স্বস্তি দিতে এই বাড়তির অগ্রিম করের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা উচিত।” > — ড. এম মাসরুর রিয়াজ, চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ
বাস্তবতা বনাম সরকারি দাবি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা বিশাল এক জনগোষ্ঠীর (বিশেষ করে বয়স্ক ও নারীদের) করযোগ্য আয় নেই। অনেকেরই নেই টিআইএন (TIN) নম্বর বা রিটার্ন জমা দেওয়ার অভিজ্ঞতা। ফলে বছর শেষে এনবিআরের কাছ থেকে টাকা ফেরত বা রিফান্ড পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের জন্য সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়াবে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
যদিও বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জমান মজুমদার দাবি করেছেন, ‘এবারের বাজেটে সঞ্চয়পত্র নিয়ে নতুন কিছু করা হয়নি।’ তবে আইনের ভেতরের এই সূক্ষ্ম পরিবর্তন যে সাধারণ মানুষের পকেট সরাসরি হালকা করে দিচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মূল্যস্ফীতির এই বাজারে মধ্যবিত্তের টিকে থাকার শেষ অবলম্বনটুকুতে সরকারের এমন নজরদারি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।