স্কোরবোর্ডের দিকে তাকিয়ে যে কারও চোখ কচলাতে বাধ্য। ২ ওভার শেষ, রান সংখ্যা শূন্য, অথচ ততক্ষণে হাওয়া হয়ে গেছে ৩টি মূল্যবান উইকেট! প্রতিপক্ষ কোনো পুঁচকে দল নয়, খোদ বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়া। মিরপুরের শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে আজ এমনই এক অবিশ্বাস্য, অলৌকিক বোলিং তাণ্ডব দেখাল বাংলাদেশ। নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসের ১০২৪তম ম্যাচে এসে এই প্রথম শূন্য রানে ৩ উইকেট হারানোর চরম লজ্জার রেকর্ড গড়ল অজিরা। আর এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো অজি-বধের ঐতিহাসিক ওয়ানডে সিরিজ নিশ্চিত করল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
এই জয়ের ফলে ক্রিকেট বিশ্বের এক অনন্য বৃত্ত পূরণ করল বাংলাদেশ। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে এত দিন শুধু ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জেতা বাকি ছিল। আজকের রূপকথার জয়ে ক্যাঙ্গারুদের দুর্গ ভেঙে শুধু ইংল্যান্ড ছাড়া বাকি সব দেশের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের গৌরব অর্জন করল টাইগাররা। এটি ঘরের মাঠে বাংলাদেশের টানা ৫ম ওয়ানডে সিরিজ জয়।
তাসকিন-মোস্তাফিজের আগুন: ২ ওভারে ০ রানে নেই ৩ উইকেট!
টস জিতে প্রথমে বোলিং করতে নেমে ইনিংসের প্রথম ওভারেই মিরপুরে আগুন ঝরান তাসকিন আহমেদ। আগের ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও অজি ওপেনার ম্যাথু শর্টকে রীতিমতো বোকা বানান তিনি। বল ‘লিভ’ করতে গিয়ে শর্ট দেখেন তাঁর স্টাম্প উড়ে গেছে।
পরের ওভারে বল হাতে আসেন ‘কাটার মাস্টার’ মোস্তাফিজুর রহমান। ওভারের প্রথম বলেই কুপার কনোলিকে লিটন দাসের ক্যাচ বানিয়ে ফেরান তিনি। আর শেষ বলে ম্যাট রেনশকেও একই ফাঁদে ফেলেন ফিজ। ফলাফল—২ ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়ার স্কোরবোর্ড: ০ রান, উইকেট ৩টি! ওয়ানডে ইতিহাসে এই নিয়ে মাত্র তৃতীয়বার অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনারই ‘ডাক’ মেরে সাজঘরে ফিরলেন।
???? লাবুশেন-গ্রিনের প্রতিরোধ ও তাসকিনের কামব্যাক
প্রাথমিক ধাক্কা সামলে জস ইংলিস ও ক্যামেরন গ্রিন কিছুটা চেষ্টা করলেও তানভীর ইসলামের স্পিন ঘূর্ণি অজিদের ৮১ রানেই ৬ উইকেটে পরিণত করে। তবে সেখান থেকে মার্নাস লাবুশেন ও ক্যামেরন গ্রিন ১১৫ বলে ১০৩ রানের অনবদ্য জুটি গড়ে দলকে লড়াকু পুঁজি এনে দেন। কিন্তু ডেথ ওভারে আবারও তাসকিন-ম্যাজিক! পরপর দুই বলে গ্রিন ও অ্যাডাম জাম্পাকে বোল্ড করে অস্ট্রেলিয়াকে ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রানে আটকে দেয় বাংলাদেশ। এরপরই বৃষ্টি নামলে অজিদের ইনিংস সেখানেই শেষ হয়।
ডিএলএস লক্ষ্য ও শান্ত-সৌম্যর জয়ের ভিত
বৃষ্টি আইনে (DLS) ৪aligned১ ওভারে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯২ রান। রান তাড়া করতে নেমে ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই তানজিদ হাসান আউট হলে কিছুটা শঙ্কা জেগেছিল। তবে সেই শঙ্কা উড়িয়ে দেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও সৌম্য সরকার।
শুরুর দিকে জীবন পেয়ে অজি বোলারদের ওপর চড়াও হন দুজনে। দৃষ্টিনন্দন সব শটে বল সীমানাছাড়া করে ৯৩ বলে ৮৬ রানের এক দুর্দান্ত জুটি গড়েন তারা। যদিও দুজনেই ৪২ রান করে আউট হওয়ায় ফিফটি না পাওয়ার আফসোস থেকে গেছে।
| ব্যাটার | রান | বল | চার/ছক্কা |
| সৌম্য সরকার | ৪২ | - | - |
| নাজমুল হোসেন শান্ত | ৪২ | - | - |
| তাওহিদ হৃদয় | ৪০* | - | - |
| মেহেদী হাসান মিরাজ | ২২* | - | ছক্কা মেরে ম্যাচ জয় |
মিরাজের ছক্কায় ঐতিহাসিক ফিনিশিং
মাঝপথে ১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ কিছুটা বিপদে পড়লেও হাল ধরেন তাওহিদ হৃদয় ও মেহেদী হাসান মিরাজ। এর মধ্যে ব্যাটিং করার সময় মাথায় বল লেগে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন মিরাজ। তবে মাঠ ছাড়েননি তিনি। শরীরের তীব্র অস্বস্তি নিয়েও হৃদয়ের সাথে ৪৮ বলে ৫১* রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন। অবশেষে ছক্কা মেরে, ৩৫ ওভারেই (৩৬ বল হাতে রেখে) বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সিরিজ জয় নিশ্চিত করে অপরাজিত মাঠ ছাড়েন মিরাজ ও হৃদয় (৪০*)।
মুক্ত প্রভাত মূল্যায়ন: এই জয় কেবল একটি সিরিজ জয় নয়, এটি বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের এক নতুন রাজত্বের ঘোষণা। যে দলটিকে ওয়ানডেতে কখনো সিরিজ হারানো যায়নি, তাদেরকেই টানা দুই ম্যাচে যেভাবে নাস্তানাবুদ করল শান্ত বাহিনী, তা দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এখন কেবল অপেক্ষা চির অধরা ‘ইংল্যান্ড’ বধের!