এক নতুন রাজনৈতিক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি সরকারের বর্তমান মেয়াদের প্রথম এই বাজেট একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের পকেটে স্বস্তির সুবাতাস এনেছে, অন্যদিকে কিছু বিলাসবহুল ও ক্ষতিকর পণ্যের ওপর বসিয়েছে করের চাবুক। অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণার পরপরই আইনি নিয়মে কার্যকর হয়ে গেছে নতুন শুল্ককর। তবে সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের বাজেটে দাম বাড়ার চেয়ে দাম কমার পণ্যের তালিকাই বেশ দীর্ঘ।
নিচে একনজরে দেখে নেওয়া যাক নতুন অর্থবছরে কোন কোন পণ্যের বাজার গরম হচ্ছে আর কোনগুলোতে মিলছে বড় ছাড়:
???? করের ধাক্কায় যেসকল পণ্যের বাজার চড়া
জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও পরিবেশ দূষণ রোধে বেশ কিছু পণ্যের ওপর কঠোর অবস্থান নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পকেট কাটবে সাধারণ ক্রেতাদের:
সিগারেট ও নিকোটিন: ধূমপায়ীদের জন্য সুখবর নেই। নিম্ন থেকে অতি উচ্চ—সব স্তরের সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া যুবসমাজকে রক্ষায় নিকোটিন পাউচ ও গ্র্যানুলসের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
জালানিচালিত গাড়ি ও গ্যাস সিলিন্ডার: পরিবেশবান্ধব যাতায়াত নিশ্চিত করতে ১,২০০ থেকে ১,৬০০ সিসির ডিজেল-পেট্রোলচালিত গাড়ির করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে একলাফে ১৫৬ শতাংশ করা হয়েছে। বাড়তে পারে আমদানিকৃত কম্পোজিট এলপিজি সিলিন্ডারের দামও।
আমদানিকৃত খাদ্য ও প্রসাধন: দেশীয় চাষীদের সুরক্ষায় বিদেশি কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া বিদেশি পাঙাশের ফিলে, মধু, সুপারি, কফি ও সুগার কনফেকশনারির দাম বাড়বে। নারীদের সাজগোজের প্রসাধন সামগ্রী যেমন আমদানিকৃত লিপ লাইনার ও জেলের শুল্কায়ন মূল্যও বাড়ানো হয়েছে।
রড ও আবাসন: আবাসন খাতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, কারণ রড তৈরির উপকরণের ওপর ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। এর পাশাপাশি বিদেশি টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার, বেসিন, ওভেন ও খেলনার দামও বাড়ছে।
???? শুল্কছাড়ে যেসকল পণ্যে মিলবে স্বস্তি
বিগত দিনের লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে পিষ্ট হওয়া জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী একঝাঁক পণ্যে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে:
৬০টি নিত্যপণ্য ও মসলা: চাল, ডাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, তেল, চিনিসহ ৬০টি অতিপ্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের উৎসে কর কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া জিরা, দারুচিনি, এলাচসহ সব ধরনের মসলা এবং খেজুর আমদানির ওপর থেকে ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়েছে।
ল্যাপটপ ও কম্পিউটার: প্রযুক্তিপ্রেমী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটি মেগা বাজেট! ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, সার্ভার, মনিটর ও প্রিন্টার আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
চিকিৎসা ও ওষুধ: ক্যানসারের ওষুধ তৈরির ৯টি নতুন কাঁচামালে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় মানবিক সিদ্ধান্ত এসেছে কিডনি রোগীদের জন্য; ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর তুলে নেওয়ায় প্রতিবার ডায়ালাইসিসে খরচ কমবে প্রায় ৮০০ টাকা।
ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (EV): পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ির করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার ডলার মূল্যের গাড়ির ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ করা হয়েছে। কমছে এর রেজিস্ট্রেশন ফি-ও।
সোনা, শিশুখাদ্য ও সংস্কৃতি: সোনা সরবরাহে ভ্যাট ও কর কমিয়ে ভরিপ্রতি মাত্র ২,৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে। কমছে শিশুখাদ্য, গিটার-পিয়ানোর মতো বাদ্যযন্ত্র এবং সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরার দামও।
মুক্ত প্রভাত মূল্যায়ন: করের বোঝা চাপিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর সনাতন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে, এই বাজেটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও প্রযুক্তি খাতকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই শুল্কছাড়ের সুফল ব্যবসায়ীরা সাধারণ ভোক্তার দোরগোড়ায় কত দ্রুত পৌঁছে দেন।