১০ জুন, ২০২৬

বিশ্বকাপের মহাদ্বৈরথ: গোলপোস্ট থেকে আক্রমণভাগে কে কোথায় সেরা—আর্জেন্টিনা নাকি ব্রাজিল?

বিশ্বকাপের মহাদ্বৈরথ: গোলপোস্ট থেকে আক্রমণভাগে কে কোথায় সেরা—আর্জেন্টিনা নাকি ব্রাজিল?

আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে পর্দা উঠছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের। মাঠের চূড়ান্ত লড়াই শুরু হওয়ার আগেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে তুমুল তুঙ্গে উঠেছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দক্ষিণ আমেরিকান পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। গোলরক্ষক থেকে শুরু করে আক্রমণভাগ—বিশ্বজয়ের এই মহমঞ্চে দলীয় শক্তিতে কে কোথায় এগিয়ে, তা ‘মুক্ত প্রভাত’-এর পাঠকদের জন্য বিশদভাবে তুলে ধরা হলো:

১. গোলপোস্টের লড়াই: মার্তিনেজ বনাম আলিসন
ফুটবলে প্রবাদ আছে, রক্ষণের শেষ প্রহরীই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেন। এই পজিশনে দুই দলেই আছেন বিশ্বসেরা দুই তারকা—আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও ব্রাজিলের আলিসন বেকার।

এমিলিয়ানো মার্তিনেজ (আর্জেন্টিনা): কাতার বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষক ‘দিবু’ মার্তিনেজ আর্জেন্টিনার জার্সিতে বড় মঞ্চে এককথায় অপ্রতিরোধ্য। ওপেন প্লে-তে বিশ্বসেরা না হলেও, পেনাল্টি শুটআউট ও টাইব্রেকারে তাঁর মানসিক দৃঢ়তা এবং দক্ষতা অবিশ্বাস্য। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অতিমানবীয় সব সেভ করে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়াই তাঁর মূল ইউএসপি (USP)।

আলিসন বেকার (ব্রাজিল): ট্যাকটিক্যালি আলিসন বিশ্বের অন্যতম পরিপূর্ণ গোলরক্ষক। শট ঠেকানো, ক্রস নিয়ন্ত্রণ এবং ওয়ান-অন-ওয়ান পজিশনে তিনি অনন্য। ব্রাজিলের হাইলাইন ডিফেন্স সিস্টেমে তিনি দারুণ ‘সুইপার-কিপার’ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে টাইব্রেকার বা পেনাল্টি শুটআউটে মার্তিনেজের চেয়ে তিনি কিছুটা পিছিয়ে।

রেটিং: বড় টুর্নামেন্টে নকআউট পর্বের প্রভাব ও টাইব্রেকারের দক্ষতার কারণে গোলপোস্টের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা সামান্য এগিয়ে থাকবে।

২. রক্ষণভাগ: অভিজ্ঞতা বনাম গভীরতা
২০২২ বিশ্বকাপের পর থেকে পরিসংখ্যানের বিচারে আর্জেন্টিনা কম গোল খেলেও, ব্যক্তিগত সামর্থ্য ও বেঞ্চের গভীরতার দিক থেকে ব্রাজিলের রক্ষণভাগ বেশ শক্তিশালী।

ব্রাজিল: মারকিনিওস, ব্রেমার এবং আর্সেনালের হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটানো গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েসের উপস্থিতিতে সেলেসাওদের সেন্ট্রাল ডিফেন্স দারুণ সুসংহত। বিশেষ করে গ্যাব্রিয়েলের শারীরিক শক্তি ও এরিয়াল ডমিনেন্স ব্রাজিলের বড় প্লাস পয়েন্ট। তবে তাদের মূল দুর্বলতা ফুলব্যাক পজিশনে।

আর্জেন্টিনা: ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও নিকোলাস ওতামেন্দির অভিজ্ঞ জুটির ওপর ভরসা স্কালোনির। রোমেরোর আগ্রাসী ট্যাকল ও ওতামেন্দির অভিজ্ঞতার সাথে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ দলে বৈচিত্র্য এনেছেন। ফুলব্যাকে মলিনা ও তাগলিয়াফিকো বিশ্বসেরা না হলেও কোচের সিস্টেমের সাথে দারুণ মানিয়ে নিয়েছেন।

রেটিং: স্কোয়াডের গভীরতা এবং সেন্টারব্যাকদের বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় রক্ষণে ব্রাজিল কিছুটা এগিয়ে।

৩. মাঝমাঠ: বোঝাপড়া বনাম শারীরিক সক্ষমতা
মিডফিল্ড বা মাঝমাঠই যেকোনো ম্যাচের চালিকাশক্তি। এই বিভাগেই দুই দলের শক্তির পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট।

দল মূল শক্তি দুর্বলতা
আর্জেন্টিনা এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক আলিস্টার ও রদ্রিগো দি পলের সমন্বয়ে গড়া ত্রয়ী। পাসিং রেঞ্জ, টেম্পো নিয়ন্ত্রণ ও দি পলের ‘ইঞ্জিন’ সদৃশ ওয়ার্করেট মাঝমাঠকে বিশ্বসেরা করে তুলেছে। খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত চোটের ঝুঁকি।
ব্রাজিল ব্রুনো গিমারেসের বল প্রোগ্রেসন ও লং পাস। সাথে আছেন অভিজ্ঞ কাসেমিরো ও সৃষ্টিশীল লুকাস পাকেতা। কাসেমিরোর পড়তি ফর্ম, ধারাবাহিকতার অভাব এবং মাঝমাঠে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে খেই হারিয়ে ফেলা।

রেটিং: দলগত বোঝাপড়া, প্রেস-রেজিস্ট্যান্স এবং মাঝমাঠের পুরো নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষমতায় আর্জেন্টিনা অনেকটাই এগিয়ে।

৪. আক্রমণভাগ: শৃঙ্খলা বনাম বিস্ফোরক জাদু
দুই দলের ফুটবল ঘরানার আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে তাদের আক্রমণভাগে। একদিকে আর্জেন্টিনার সুশৃঙ্খল ফুটবল, অন্যদিকে ব্রাজিলের প্রতিভার বিস্ফোরণ।

ব্রাজিল: ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, নেইমার, এনদ্রিক ও মাতেউস কুনিয়ার উপস্থিতি সেলেসাও আক্রমণভাগকে করেছে অতিমাত্রায় বৈচিত্র্যময় ও বিস্ফোরক। বিশেষ করে ভিনিসিয়ুসের গতি ও ‘স্পেস অ্যাটাক’ এবং নেইমারের ড্রিবলিং যেকোনো ডিফেন্স ভাঙতে সক্ষম। তাদের বেঞ্চের শক্তিও অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

আর্জেন্টিনা: মহাতারকা লিওনেল মেসিই এই আক্রমণের মূল ‘নিউক্লিয়াস’। গোলস্কোরিং ও প্লে-মেকিং দুই ভূমিকাতেই তিনি অনন্য। তাঁর সাথে হুলিয়ান আলভারেজের অক্লান্ত প্রেসিং এবং লাউতারো মার্তিনেজের নিখুঁত ফিনিশিং আর্জেন্টিনার বড় শক্তি। তবে দলে অতিরিক্ত ‘মেসি-নির্ভরতা’ বড় ম্যাচে চিন্তার কারণ হতে পারে।

রেটিং: আক্রমণভাগের গভীরতা, গতি এবং বিকল্প খেলোয়াড়দের প্রাচুর্যের কারণে এই বিভাগে ব্রাজিল সামান্য এগিয়ে থাকবে।

চূড়ান্ত মঞ্চে কার কৌশল কতটা কার্যকর হয়, তা দেখার জন্যই এখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ আটকাচ্ছে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে।