হেমন্তে যে চলনবিল ধু-ধু ফসলি মাঠ, বর্ষায় তা-ই রূপ নেয় এক অতল জলধিতে। প্রকৃতির এই দুই রূপ যেমন এ অঞ্চলের সৌন্দর্য, তেমনি চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার এক বড় চ্যালেঞ্জও বটে। এখানকার শিশুদের শৈশব আর দশটা অঞ্চলের মতো নয়। জলমগ্নতা কিংবা ধু-ধু মেঠো পথের দুর্গমতা পেরিয়ে শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানো এই অঞ্চলের অনেক অভাবী পরিবারের জন্যই ছিল এক কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গুরুদাসপুরের প্রাথমিক শিক্ষা অঙ্গনে এক নতুন আশার আলো সঞ্চারিত হয়েছে। সেই আলোর নাম ‘স্কুল ফিডিং কর্মসূচি’।
২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর গুরুদাসপুরের খুবজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেশের যে ১৫০টি উপজেলাকে এই প্রকল্পের জন্য নির্বাচন করেছে, তার মধ্যে অন্যতম আমাদের এই গুরুদাসপুর। বর্তমানে উপজেলার ৯০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৮,৪৬৬ জন কোমলমতি শিক্ষার্থী এই কর্মসূচির আওতায় এসেছে। সপ্তাহের প্রতি কর্মদিবসে প্রতিটি শিশুর হাতে পৌঁছে যাচ্ছে ফরটিফাইড বিস্কুট, ইউএইচটি দুধ, ডিম, কলা বা স্থানীয় ফল। পরিসংখ্যান বলছে, এই খাবার শিক্ষার্থীদের দৈনিক প্রয়োজনীয় মোট ক্যালরির প্রায় ২৬ শতাংশ এবং প্রোটিনের ১৬ শতাংশ পূরণ করছে। তবে এই কর্মসূচিকে শুধু কিছু পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি আসলে এ অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, ঝরে পড়া রোধ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের এক নীরব বিপ্লব।

চলনবিল অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান সংকট ছিল পুষ্টিহীনতা এবং মাঝপথে বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া বা ‘ড্রপআউট’। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত অনেক পরিবারই শিশুর সকালের পুষ্টিকর খাবারের জোগান দিতে হিমশিম খায়। খালি পেটে ক্লাসে বসা শিশুর পক্ষে পাঠে মনোযোগ দেওয়া অসম্ভব। স্কুল ফিডিং কর্মসূচিটি এই চেনা সমীকরণটি বদলে দিয়েছে। এখন শিশুরা খাবারের আকর্ষণে এবং পুষ্টির তাড়নায় আনন্দের সাথে বিদ্যালয়ে আসছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ইতিমধ্যেই ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। যে মায়েরা আগে সন্তানদের মাঠে বা ঘরের কাজে পাঠাতে বাধ্য হতেন, তারা এখন পরম নিশ্চিন্তে সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন। কারণ তারা জানেন, বিদ্যালয়ে শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়, সন্তানের সুস্বাস্থ্যের দায়িত্বও রাষ্ট্র ভাগ করে নিয়েছে।
তবে চলনবিলের ভৌগোলিক বাস্তবতায় এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পুষ্টি ও শিক্ষা নিশ্চিত করার পথটি পুরোপুরি মসৃণ নয়। বর্ষাকালে যখন বিলের উত্তাল তরঙ্গের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া বন্যা বা জলাবদ্ধতার সময়ে খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ এবং বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাও কম কঠিন নয়।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা এই চ্যালেঞ্জগুলোকে শুরু হতেই মোকাবেলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। বর্ষা মৌসুমে দুর্গম স্কুলগুলোতে বিশেষ নৌকার মাধ্যমে আগাম খাবার পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে খাবারের গুণগত মান এবং মেয়াদ কঠোরভাবে তদারকি করতে শিক্ষা কর্মকর্তা ও ট্যাগ অফিসারদের মাধ্যমে নিয়মিত ঝটিকা পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি এই উদ্যোগকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন ‘কমিউনিটি এনগেজমেন্ট’ বা সামাজিক সম্পৃক্ততা। মা সমাবেশ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে, যেন তারা বুঝতে পারেন—এই কর্মসূচি কোনো অনুদান নয়, এটি তাদের সন্তানের সুন্দর আগামীর বুনিয়াদ। পাশাপাশি স্থানীয় বিত্তবান, সমাজসেবী এবং চলনবিল অঞ্চলে কর্মরত এনজিওগুলোর সমন্বিত প্রয়াস এই কর্মসূচির পরিধি ও মানকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্য হলো ক্ষুধামুক্ত সমাজ গঠন এবং মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। স্কুল ফিডিং কর্মসূচি গুরুদাসপুরের ১৮,৪৬৬ জন শিশুর পুষ্টিহীনতা দূর করার পাশাপাশি তাদের ক্লাসরুমের মুখোমুখি বসার সমান সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ভুলে সব শিশু যখন একসাথে বসে খাবার খাচ্ছে, তখন সেখানে একটি বৈষম্যহীন ও সহমর্মী সমাজ গঠনের বীজ বপন হচ্ছে। ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিকর শৈশবই পারে মানসম্পন্ন শিক্ষার মজবুত ভিত্তি গড়ে দিতে। আমরা বিশ্বাস করি, গুরুদাসপুরের প্রতিটি শিশু আগামী দিনের সম্পদ। উপজেলা প্রশাসনের সুশাসন, কঠোর তদারকি এবং স্থানীয় জনগণের আন্তরিক সহযোগিতায় এই স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চলনবিলের প্রান্তিক জনপদের প্রাথমিক শিক্ষাকে সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে দাঁড় করাবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
(লেখক: ফাহমিদা আফরোজ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, গুরুদাসপুর, নাটোর)