৬ জুন, ২০২৬

চুক্তি ছাড়া ইরানের সামনে কোনো বিকল্প নেই: ডোনাল্ড ট্রাম্প

চুক্তি ছাড়া ইরানের সামনে কোনো বিকল্প নেই: ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানের শীর্ষ নেতারা অত্যন্ত ‘শক্তিশালী’ ও ‘অহংকারী’ মানসিকতার। আর এই অহমিকার কারণেই তারা চলমান সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে এখনো রাজি হয়নি। তবে পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তিতে আসা ছাড়া তেহরানের সামনে ‘কোনো বিকল্প নেই’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের চিপেওয়া ফলসে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব কথা বলেন। এনবিসি নিউজের বিখ্যাত ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ক্রিস্টেন ওয়েলকারকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর প্রশাসনের অবস্থান পরিষ্কার করেন।

‘চুক্তি করতে বছরের পর বছর লেগে যায়’
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “তারা (ইরানি নেতা) শক্তিশালী, তারা অহংকারী। এমন কিছু বিষয় আছে, যা তারা কোনোদিন করবে বলে ভাবেনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করবে। তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই, তবে পুরো প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগছে।”

একই সাথে, যারা এই সংঘাতের দ্রুত অবসান ঘটিয়ে ইরানের সাথে তাড়াহুড়ো করে চুক্তি করার জন্য চাপ দিচ্ছেন, তাদের কড়া সমালোচনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, “এসব জটিল বিষয়ে চুক্তি করতে বছরের পর বছর লেগে যায়।”

চলমান এই সংঘাতকে ঐতিহাসিক ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধ’-এর সাথে তুলনা করে ট্রাম্প বলেন, “আমি অত্যন্ত দ্রুত এগোচ্ছি। এই যুদ্ধ মাত্র চার মাসে (চতুর্থ মাস) গড়িয়েছে। আপনারা জানেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ ১৯ বছর স্থায়ী হয়েছিল। আর আমি মাত্র আমার তৃতীয়-চতুর্থ মাসে আছি, অথচ সবাই এখনই বলছে—‘আপনি কবে জিতবেন?’ আমি যদি ডেমোক্র্যাট হতাম, তবে কেউ এভাবে কথা বলতো না। তবে আমি এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।”

‘২১ থেকে ২২ শতাংশ সক্ষমতা বাকি আছে ইরানের’
মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, এই চলমান সংঘাতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ইরানের কাছে এখনো কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়ে গেছে।

হামলার বিবরণ দিয়ে ট্রাম্প বলেন, “তাদের বেশির ভাগ ড্রোন তৈরির কারখানা, উৎক্ষেপণ কেন্দ্র (লঞ্চিং প্যাড) এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এলাকাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের এখনো সামান্য কিছু সক্ষমতা রয়েছে। আমি বলব, শতকরা হিসাবে তাদের হয়তো ২১ থেকে ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র বাকি আছে। এটিও সংখ্যার দিক থেকে অনেক, তবে আমরা যখন প্রথম হামলা চালিয়েছিলাম—তার তুলনায় এটি কিছুই না।”

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ হয়েছে
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের আইনপ্রণেতাদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, ইরানে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিচালিত বিশেষ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। রুবিও দাবি করেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন বাহিনীর চালানো হামলাগুলো ছিল মূলত ‘আত্মরক্ষামূলক’। হরমুজ প্রণালির কাছে বিভিন্ন জাহাজে ইরানের হামলার জবাব দিতেই ওয়াশিংটন এই পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছিল।

পারস্য উপসাগরে নতুন উত্তেজনা ও বিকল্প পথ
গত এপ্রিলে দুই দেশ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে পারস্য উপসাগরে উপর্যুপরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ইরান দেখিয়েছে যে তাদের সামরিক সক্ষমতা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। এমনকি কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও আঘাত হেনেছে তারা।

মূলত ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এই যুদ্ধকে ‘প্রয়োজনীয়’ মনে করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে নিউইয়র্ক পোস্টের এক পডকাস্টে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার পর মার্কিন প্রশাসন যে নৌ অবরোধ আরোপ করেছিল, তা আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শ্রম দিবসের (Labor Day) পর বহাল থাকার সম্ভাবনা কম।

কারণ হিসেবে দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারেও তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর তীব্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।

সবশেষে ইরানি নেতাদের প্রতি এক চরম বার্তা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমাদের কি একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করা উচিত, নাকি অন্য পথে হাঁটা উচিত? আর মনে রাখবেন, সেই অন্য পথটি কিন্তু কারো জন্যই মোটেও ভালো কিছু হবে না।”