৯০ মিনিটের নির্ধারিত খেলা শেষ। অতিরিক্ত ৬ মিনিটের তখন চলছে তৃতীয় মিনিট। গোয়ার জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের প্রেসবক্স থেকে শুরু করে গ্যালারি—সবখানেই স্নায়ুচাপ তখন চরমে। ঠিক সেই মুহূর্তে শামসুন্নাহার জুনিয়রের বুদ্ধিদীপ্ত এক পাস খুঁজে নিল বক্সের ভেতরে থাকা সাগরিকাকে। নেপালের দুই ডিফেন্ডারের কড়া পাহাড়ার জটলার ভেতর থেকেই বল চলে গেল জালে! গ্যালারির হাজার খানেক নেপালি দর্শককে স্তব্ধ করে উল্লাসে মাতল লাল-সবুজের বাংলাদেশ।
পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের এই রোমাঞ্চকর নাটকীয়তায় নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়ে অষ্টম সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠে গেল বাংলাদেশ। আর এই মহাকাব্যিক জয়ের হাত ধরেই অক্ষুণ্ণ থাকল বাংলাদেশের মেয়েদের হ্যাটট্রিক শিরোপার স্বপ্ন।
অথচ ম্যাচের শুরুটা মোটেও এমন স্বস্তির ছিল না। স্থানীয় সময় বেলা ৪টায় যখন ম্যাচ শুরু হয়, তখন মাথার ওপর চড়া রোদ আর তীব্র গরমে মাঠে দৌড়ানোই ছিল দায়। গত দুবারের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের চেনা ফুটবল যেন প্রথম ৪৫ মিনিটে পুরোপুরি হারিয়ে গিয়েছিল। পাসিংয়ের সমন্বয়হীনতা আর রক্ষণভাগের খেই হারিয়ে ফেলার সুযোগ নিয়ে ম্যাচের ২২ মিনিটেই কর্নার থেকে গোল করে নেপালকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন গীতা রানা।
১ গোল খাওয়ার পর আরও গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। ৩৬ মিনিটে নেপালের প্রীতি রাইয়ের একটি বুলেট গতির শট গোলরক্ষক মিলির হাতে লেগে ক্রসবারে প্রতিহত না হলে ব্যবধান তখনই দ্বিগুণ হতে পারত। ভাগ্যদেবীর সহায়তায় বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশ প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে সমতায় ফেরে ঋতুপর্ণা চাকমার এক জাদুকরী ‘অলিম্পিক গোলে’। বাঁ পায়ের এক বাঁকানো কর্নারে সরাসরি বল জালে জড়িয়ে পুরো শিবিরে প্রাণ ফিরিয়ে আনেন তিনি।
১-১ সমতায় বিরতি থেকে ফিরে দ্বিতীয়ার্থেও আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের ধার বাড়ায় দুই দলই। ম্যাচের বয়স যত বেড়েছে, রোমাঞ্চ আর স্নায়ুচাপ ততই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। যখন সবাই ধরে নিয়েছিল ম্যাচটি অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে গড়াতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই আসে ৯৩ মিনিটের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সাফের অফিশিয়াল ম্যাচ রিপোর্টে অবশ্য শেষ গোলটিকে নেপালের প্রীতি রাইয়ের আত্মঘাতী গোল হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ম্যাচসেরা নির্বাচিত হয়েছেন চোখধাঁধানো গোল করা ঋতুপর্ণা চাকমা। আগামী ৬ জুনের ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হবে ভারত ও ভুটানের মধ্যকার দ্বিতীয় সেমিফাইনালের জয়ী দল। ফাইনালে ট্রফি কার ঘরে যাবে তা সময়ই বলে দেবে, তবে খাদের কিনারা থেকে মারিয়া-সাবিনাদের এই অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প ফুটবলপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে থাকবে অনেক দিন।