১ জুন, ২০২৬

তলানিতে মার্কিন জরুরি তেল মজুত, বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

তলানিতে মার্কিন জরুরি তেল মজুত, বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকটের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজেদের ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ বা এসপিআর (জরুরি তেল মজুত) থেকে রেকর্ড পরিমাণে তেল ছাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে দেশটির এই জাতীয় ভাণ্ডার এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গত ২৮ মে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সংকট মেটাতে জরুরি মজুত এভাবে খালি করার কারণে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ—উভয় ক্ষেত্রেই মারাত্মক চাপ তৈরি হবে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বৈপরীত্য ও বর্তমান বাস্তবতা
২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনী প্রচারণার সময় জো বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ফায়দা লুটের জন্য জাতীয় তেলভাণ্ডার খালি করার তীব্র অভিযোগ তুলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বর্তমানে ইরান সংকটের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেই সেই একই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে এবং ব্যাপক হারে মজুত থেকে তেল বাজারে ছাড়ছে।

জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর প্রধান তেল বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ সতর্ক করে বলেছেন, “এই মজুত একসময় যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় পূরণ করতে হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হবে, যা তেলের দামকে আরও আকাশচুম্বী করে তুলবে।”

সংকটে শেষ ভরসা, কমেছে ৫ কোটি ব্যারেল
টেক্সাস ও লুইজিয়ানার ভূগর্ভস্থ গুহায় সংরক্ষিত ‘এসপিআর’ হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় জরুরি অপরিশোধিত তেলের ভাণ্ডার। সাধারণত যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বড় সংকটে এটি ব্যবহার করা হয়।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: এই যুদ্ধের সময় ব্যাপক তেল ছাড়ার কারণে মার্কিন মজুত ৬৩ কোটি ব্যারেল থেকে কমে ৩৫ কোটির নিচে নেমে গিয়েছিল।

বর্তমান ইরান সংকট: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এসপিআর-এর মজুত আরও প্রায় ৫ কোটি ব্যারেল কমে বর্তমানে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলে এসে ঠেকেছে।

কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল ও মে মাসে এই জরুরি মজুত থেকে তোলা তেলের প্রায় অর্ধেকই বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ বন্ধ থাকায় ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের তেলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ম্যাট স্মিথের ভাষায়, “বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত শেষ ভরসা হিসেবে কাজ করছে।”

বাণিজ্যিক মজুতও বিপজ্জনক সীমায়
শুধু জরুরি সরকারি মজুতই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক তেলভাণ্ডারও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ওকলাহোমার কুশিং কেন্দ্র—যেখান থেকে বিশ্বখ্যাত ডব্লিউটিআই (WTI) তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়—সেখানে গত সাত সপ্তাহে মজুত কমেছে প্রায় ৮৫ লাখ ব্যারেল। বর্তমানে কুশিংয়ের মজুত ২ কোটি ৪৫ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা এই কেন্দ্রটি সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন সীমার অত্যন্ত কাছাকাছি।

আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক পণ্যকৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, “পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যেখানে তেলের সংরক্ষণ ট্যাংকগুলোর মজুত বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে যেতে পারে।” তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কোনো সমঝোতার আশায় বাজার সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে।

রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের গুঞ্জন
জরুরি ও বাণিজ্যিক উভয় মজুত আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়ায় গুঞ্জন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো নিজের বাজার ধরে রাখতে তেল রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। যদিও হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করেছে যে, আপাতত তাদের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।

মুক্ত প্রভাত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ: যুক্তরাষ্ট্র যদি তার অতিরিক্ত তেল সরবরাহের সক্ষমতা হারায় বা অভ্যন্তরীণ বাজারের স্বার্থে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে, তবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের জন্য হাহাকার পড়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের পর মার্কিন সরবরাহও যদি সংকুচিত হয়, তবে এশিয়া ও ইউরোপের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির এক ভয়াবহ সুনামি আঘাত হানতে পারে।