মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় সরকারের মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের ধাক্কা। পদত্যাগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। চিঠিতে তিনি ‘শারীরিক জটিলতা ও অসুস্থতা’র কথা উল্লেখ করলেও, পাহাড়ের রাজনৈতিক দল, সচেতন মহল এবং বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে এটি নিয়ে নানা গুঞ্জন ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
এদিকে এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই রাঙামাটিতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন দীপেন দেওয়ানের অনুসারীরা। পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার ও তাঁকে সপদে পুনর্বহালের দাবিতে তাঁরা রাঙামাটিতে সড়ক অবরোধ করে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, কোনো অসুস্থতা নয়, বরং গভীর ষড়যন্ত্র ও নানামুখী চাপ প্রয়োগ করে দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।
নেপথ্যে কী? উঠছে তিন কারণ
সাবেক যুগ্ম জেলা জজ দীপেন দেওয়ান এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ত্রয়োদশ সংসদের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে বিজয়ী সংসদ সদস্য হন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতিবিষয়ক উপদেষ্টা সুবিমল দেওয়ানের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
হঠাৎ তাঁর এই বিদায়ের বিষয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানান, বিষয়টি তাঁদের কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলের ভেতরের একটি অংশের ধারণা, এর নেপথ্যে তিনটি মূল কারণ থাকতে পারে:
১. পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালনা নিয়ে অভ্যন্তরীণ জটিলতা।
২. রাঙামাটির স্থানীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা পরিষদে ‘প্রশাসক নিয়োগ’ প্রক্রিয়া নিয়ে সৃষ্ট তীব্র মতবিরোধ।
চাপা কোন্দল এখন প্রকাশ্যে
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন আসন (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান)—সব কটিতেই এবার বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া এবং বান্দরবানের সাচিংপ্রু জেরীর সঙ্গে দীপেন দেওয়ানের সম্পর্ক আন্তরিক দাবি করা হলেও, স্থানীয় রাজনীতিতে ফাটল স্পষ্ট। রাঙামাটি জেলা বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে দীপেন দেওয়ানের অনুসারীদের সঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারের অনুসারীদের বিরোধ ছিল, যা এই পদত্যাগের পর প্রকাশ্য রূপ নিল। তবে দীপন তালুকদার এই অভিযোগ অস্বীকার করে একে মন্ত্রীর ‘ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’ বলে দাবি করেছেন।
‘রংধনু জাতি’ গঠনের স্বপ্ন ভঙ্গের আশঙ্কা
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগকে পাহাড়ের শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য বড় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন স্থানীয় শীর্ষ নেতারা। রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দীপেন দেওয়ান শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ। কিছু সুবিধাবাদী নেতা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন। তাঁর এই পদত্যাগ পাহাড়ের পাহাড়ি-বাঙালি সকল সম্প্রদায়ের ‘রংধনু জাতি’ গঠনের প্রক্রিয়া এবং বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত কর্মসূচির প্রভূত ক্ষতি করবে।”
একই সুর শোনা গেছে কাউখালী উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সাজামং মারমার কণ্ঠেও। তিনি দাবি করেন, গত ৫ আগস্টের পর যে ফ্যাসিবাদের দোসররা কোণঠাসা ছিল, তাদেরই কোনো অদৃশ্য চাপে এই সাময়িক পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও পরবর্তী সমীকরণ
১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারা অনুযায়ী—পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপজাতীয় বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে একজনকে মন্ত্রী করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর বর্তমানে এই শর্ত পূরণের জন্য সরকারের সামনে বিকল্প হিসেবে রয়েছেন বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরি।
পাহাড়ে যখন দীর্ঘ সংঘাত পেরিয়ে স্থায়ী শান্তি ও পারস্পরিক আস্থা ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছিল, ঠিক তখন সরকারের শুরুর লগ্নেই এমন একটি সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়ের অভিভাবক শূন্যতা পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।