৩১ মে, ২০২৬

সেনার বদলে ইউক্রেনের হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে রোবট

সেনার বদলে ইউক্রেনের হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে রোবট

শোঁ শোঁ শব্দ, একরাশ ধুলা আর তার পর মুহূর্তেই প্রকম্পিত করা এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় অবদিভকা বা বাখমুতের রণক্ষেত্রে এমন দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে মাঠে নেই কোনো রক্ত-মাংসের যোদ্ধা। মাটির নিচে কয়েক মাইল গভীরে, কম্পিউটার প্রসেসরের কমলারঙের আলো আর নিভু নিভু বাতির নিচে বসে গেমারদের মতো চেয়ারে হেলান দিয়ে পুরো যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করছেন ইউক্রেনের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সেনারা। ওপর থেকে নজরদারি ড্রোন আর বিশেষায়িত লাইভস্ট্রিম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এই নিখুঁত আক্রমণ। ইউক্রেনীয় যুদ্ধক্ষেত্রের এই নতুন রূপকে রুশ যুদ্ধবন্দীরা ডাকছে ‘নীরব মৃত্যু’ নামে।

জনবল সংকট আর মার্কিন সহায়তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ইউক্রেনীয় বাহিনী এখন এক অবিশ্বাস্য প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাদের যুদ্ধের একটা বড় অংশই এখন চালকবিহীন রোবট, ড্রোন ও দূরনিয়ন্ত্রিত ট্যাংকের ওপর নির্ভরশীল, যা ক্লান্ত রুশ বাহিনীকে রীতিমতো কোণঠাসা করে ফেলেছে।

এক হাজার সেনার জীবন বাঁচাল ‘এনসি১৩’
থার্ড অ্যাসাল্ট ব্রিগেডের বিশেষায়িত ‘এনসি১৩’ ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী, প্রযুক্তির এই অগ্রগতি মানবসম্পদের এক বিশাল সাশ্রয় ঘটাচ্ছে। রোবট দিয়ে পরিচালিত ১৬৪টি আক্রমণের যে ফলাফল এসেছে, তা সনাতন পদ্ধতিতে করতে গেলে অন্তত ২ হাজার ৩০০ সেনা লাগত। আর তেমন অভিযানে ইউনিটের অর্ধেক সেনারই নিহত বা আহত হওয়ার ঝুঁকি ছিল। চালকবিহীন এই আত্মঘাতী বোমাগুলো ফ্রন্টলাইনে এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ইউক্রেনীয় সেনার জীবন বাঁচিয়েছে।

দনবাসের নৃশংস দিনগুলোর স্মৃতি চারণ করে ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার ‘বার’ বলেন, “তখনকার দিনে আমি এমন কিছু কল্পনাও করতে পারতাম না। এখন বুঝতে পারছি, সেই সময়ে এ ধরনের সরঞ্জাম থাকলে আমার আরও অনেক কমরেড বেঁচে যেতেন।” তবে ইউনিটের কমান্ডার মাইকোলা ‘মাকার’ জিনকেভিচের কণ্ঠে কিছুটা অপূর্ণতার সুর। তাঁর মতে, “তখনকার যুদ্ধটা অনেক বেশি পুরুষোচিত ছিল, যেখানে মানুষের দক্ষতা আর সুশাসন শেষ কথা বলত। এখন প্রযুক্তি সবকিছু নির্ধারণ করে এবং এখান থেকে পেছনে ফেরার আর কোনো পথ নেই।”

রাশিয়ার ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ
ইউক্রেনের বর্তমান কৌশল হচ্ছে প্রতি মাসে ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হতাহত করা, যা ক্রেমলিনকে রাশিয়ার বড় শহরগুলো এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে অপ্রিয় উপায়ে সেনা নিয়োগে বাধ্য করবে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ (GCHQ) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধে রাশিয়ার মোট নিহত সেনার সংখ্যা ইতিমধ্যে ৫ লাখে পৌঁছেছে।

এই নতুন যুদ্ধের অগ্রভাগে রয়েছেন ২২ বছর বয়সী গোরা’র মতো তরুণরা, যিনি নিজেকে একজন ‘এমবেডেড হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার প্রকৌশলী’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। গোরার মতে, “আসল চাবিকাঠি কোনো যানবাহন নয়, আসল হলো মানুষের মস্তিষ্ক এবং তাদের পরিকল্পনা।”

ফ্রন্টলাইনের নতুন প্রহরী
যুদ্ধক্ষেত্রে এখন পদাতিক বাহিনীর মৌলিক কাজগুলোও করে দিচ্ছে রোবট। ট্যাংকের চেইনের (ট্র্যাক) ওপর বিশাল ‘ব্রাউনিং হেভি মেশিনগান’ এবং ক্যামেরা বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে এমন এক রোবট, যা শিকারের আশায় দিনের পর দিন গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে। এর পানি, খাবার বা ক্লান্তির কোনো ভয় নেই। শুধু ৪০০ রাউন্ড গুলি শেষ হলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘাঁটিতে ফিরে আসে। এছাড়া, যুদ্ধক্ষেত্রে ঘণ্টায় ১০ মাইল বেগে চলতে সক্ষম এবং কালাশনিকভ রাইফেল বহনকারী আরও দ্রুতগতির রোবট প্রস্তুত করা হচ্ছে। রসদ সরবরাহ থেকে শুরু করে আহত সৈন্যদের উদ্ধার—সবখানেই এখন রোবটের জয়জয়কার।

ক্লান্তি আর ট্রমার গল্প
প্রযুক্তির এই দাপটের মাঝেও ফ্রন্টলাইনের সাধারণ সেনাদের ক্লান্তি ও ট্রমার ছবিটা অত্যন্ত নির্মম। দীর্ঘ এক বছর পর ফ্রন্টলাইন থেকে বেঁচে ফেরা ‘ক্রো’ নামের এক সেনা জানান, নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে তাকে টানা ১২ ঘণ্টা ধরে ২০ মাইল হাঁটতে হয়েছে। ক্রো বলেন, “কেবল স্ত্রী-সন্তানদের কথা ভেবেই আমি টিকে ছিলাম, নাহলে বহু আগেই আমি পাগল হয়ে যেতাম।”

অন্য এক সেনা ‘ক্রিপি’ শোনালেন ড্রোন হামলার সেই নারকীয় অভিজ্ঞতার কথা, যেখানে প্রতিরক্ষার জন্য বালির বস্তা তৈরি করার মতো সময় বা শক্তিও অবশিষ্ট ছিল না তাদের। আজ ক্রামাতোরস্ক শহরের আকাশে একটি সাধারণ এফপিভি (FPV) ড্রোনের শব্দ শুনলেই যেখানে স্থানীয় বাসি