২৯ মে, ২০২৬

শূন্য থেকে সাফ মঞ্চের শিখরে: অধিনায়ক মারিয়ার রাজকীয় অভিষেক ও এক অদম্য মায়ের মহাকাব্য

শূন্য থেকে সাফ মঞ্চের শিখরে: অধিনায়ক মারিয়ার রাজকীয় অভিষেক ও এক অদম্য মায়ের মহাকাব্য

সবুজ পাহাড় আর নদীঘেরা ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার প্রান্তিক গ্রাম মন্দিরগোনা। একসময় যে গ্রামের বিদ্যুৎহীন অন্ধকার ঘরে লণ্ঠন জ্বলত, সেই গ্রামেরই গারো সম্প্রদায়ের এক মেয়ে গতকাল দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইটের আলোর নিচে। সাবিনা খাতুনের পর বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের অধিনায়কের আর্মব্যান্ড উঠেছে ২৩ বছর বয়সী মাঝমাঠের প্রাণ মারিয়া মান্দার হাতে। আর অধিনায়কত্বের অভিষেকেই ম্যাচসেরার ট্রফি হাতে নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন এই ফুটবল জাদুকর।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে গতকাল মালদ্বীপের বিপক্ষে এক রোমাঞ্চকর ম্যাচে ৪–২ গোলের ব্যবধানে জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। ম্যাচের শুরুতেই আনিকার মাত্র ১১ সেকেন্ডের ঐতিহাসিক গোলটি বাংলাদেশকে এগিয়ে দেয়। মাঝে মালদ্বীপ ২–২ গোলে সমতায় ফিরে চাপ তৈরি করলেও, মারিয়ার নিখুঁত বল বণ্টন আর মাঝমাঠের দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত জয় নিয়েই সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে লড়াকু মেয়েরা।

কিন্তু এই ট্রফি, করতালি আর আলোর ঝলকানির পেছনের গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। এটি মূলত এক অদম্য মা আর তাঁর লড়াকু মেয়ের শূন্য থেকে শিখরে ওঠার এক রূপকথা।

খালি পায়ের মেয়ে ও ২০০ টাকার দিনমজুর মা
মারিয়া যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়েন, তখনই বাবা বীরেন্দ্র মারাক মারা যান। চার ভাই-বোনকে নিয়ে মা এনতা মান্দা পড়েন অথৈ সাগরে। নিজেদের কোনো জমি ছিল না। সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে মা দৈনিক মাত্র ২০০ টাকা মজুরিতে অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। সেই ঘোর অনটনের দিনে ফুটবল খেলার বুট কেনা ছিল চরম বিলাসিতা। মারিয়া তাই খেলতেন খালি পায়ে। যখনই বুট কেনা বা বাইরে খেলতে যাওয়ার টাকার প্রয়োজন হতো, মা টানা ২-৩ দিন অতিরিক্ত কাজ করে টাকা জমিয়ে মেয়ের হাতে তুলে দিতেন। বর্ষাকালে যখন নেতাই নদী উত্তাল হয়ে উঠত, তখন মাঝির অপেক্ষায় না থেকে মা নিজেই নৌকা বেয়ে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন।

খেলার পথে দারিদ্র্যের পাশাপাশি ছিল সামাজিক বাধাও। রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজ থেকে হাফপ্যান্ট পরে মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে আসত নানা কটূক্তি। কিন্তু কলসিন্দুর স্কুলের শিক্ষক মফিজ উদ্দিন ও মিনতি রানী শীলের হাত ধরে শুরু হওয়া নীরব বিপ্লব আর মায়ের অনড় বিশ্বাসের কাছে হেরে গেছে সব বাধা।

ফুটবল বদলে দিল জীবন, ঘুচল মায়ের কষ্ট
২০১১ সালে বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল দিয়ে শুরু হওয়া মারিয়ার এই যাত্রা আজ তাঁকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি। দেশের হয়ে ৫০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মারিয়া ইতিমধ্যে দুটি ঐতিহাসিক সিনিয়র সাফজয়ী দলের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি। ফুটবলে অনন্য অবদানের জন্য তিনি ভূষিত হয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ।

ফুটবল আজ মারিয়ার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ফুটবলের উপার্জনে তিনি গ্রামে জমি কিনেছেন, ছোট ভাইয়ের জন্য তৈরি করে দিয়েছেন নতুন ঘর। যে মেজো বোন পাপিয়া নিজের পড়াশোনা ছেড়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁকে আজ গ্রামের বাড়িতে একটি মুদি দোকান করে দিয়েছেন মারিয়া। আর সবচেয়ে বড় তৃপ্তি—মা-কে আর দিনমজুরের কাজ করতে দেন না। একসময় যে গ্রামবাসীরা কটূক্তি করতেন, আজ মারিয়া বাড়ি ফিরলে তাঁরাই ফুল হাতে গেট সাজিয়ে বরণ করে নেন।

ভারত ম্যাচের চ্যালেঞ্জ ও বাফুফের প্রতি একরাশ আক্ষেপ
আগামী ৩১ মে গ্রুপসেরা হওয়ার লড়াইয়ে বাংলাদেশের মুখোমুখি হবে শক্তিশালী ভারত, যারা মালদ্বীপকে ১১ গোল দিয়ে টেবিলের শীর্ষে রয়েছে। ম্যাচটি নিয়ে কিছুটা চাপ থাকলেও ম্যাচসেরা মারিয়া মান্দা মিক্সড জোনে সাংবাদিকদের বলেন, “প্রথম ম্যাচে ৩ পয়েন্ট পেয়ে খুব ভালো একটা শুরু হয়েছে। আমরা আশাবাদী, নিজেদের সেরাটা দিয়ে ভারতকে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয়েই সেমিফাইনালে খেলব।”

তবে এই সাফল্যের আনন্দের মাঝেই নারী ফুটবলের কিছু পুঞ্জীভূত আক্ষেপ ঝরে পড়ল অধিনায়কের কণ্ঠে। ক্রিকেট আর ফুটবলের ভেতরের আর্থিক বৈষম্যের কথা টেনে মারিয়া বলেন:

“মেয়েদের ক্রিকেটে বেতন, পুরস্কার সবকিছু ভালো। নারী ফুটবল দলও তা পেলে ভালো হতো। গতবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বাফুফে দেড় কোটি টাকা পুরস্কার দেবে বলেছিল, কিন্তু আমরা মেয়েরা এখনো তা পাইনি। চ্যাম্পিয়ন হয়ে পুরস্কারের অর্থ সময়মতো পেলে খেলোয়াড়দের ভালো লাগে। কিন্তু বাফুফে আমাদের সেই ভালোলাগার অনুভূতিটা দিতে পারেনি।”

বাফুফের এই অপেশাদার আচরণ ও বকেয়া বোনাসের আক্ষেপ সঙ্গী করেই আরেকটি সাফের ট্রফি ধরে রাখার মিশনে লড়ছেন মারিয়ারা। এবার যদি মেয়েরা আবার চ্যাম্পিয়ন হয়, তবে বাফুফে কী করবে—এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে।