কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের দামামা। কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে এবার মার্কিন ‘স্টিলথ’ বা রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম একটি অত্যাধুনিক গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। বন্দর আব্বাসের কাছে একটি ইরানি সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর নতুন করে হামলা চালানোর পরপরই এই ঘটনা ঘটে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
মাসের পর মাস ধরে চলা মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার পর তেহরানের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আসলে কতটুকু অবশিষ্ট আছে, তা নিয়ে যখন পশ্চিমা বিশ্বে জল্পনা-কল্পনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই এই ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা বিশ্ব সামরিক বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
পৌরাণিক বীরের নামে ‘আরাশ-ই কামানগির’
ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ‘শত্রু’র রাডার ফাঁকি দেওয়া ড্রোনটি ধ্বংস করতে তারা তাদের নতুন ও গোপন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘আরাশ-ই কামানগির’ ব্যবহার করেছে। ফারসি ভাষায় এর অর্থ ‘তিরন্দাজ আরাশ’—যা পারস্যের লোকগাথার এক পৌরাণিক বীরের নামানুসারে রাখা হয়েছে, যিনি তীর ছুঁড়ে দেশের সীমানা নির্ধারণ করেছিলেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যবস্থাটি প্রথাগত রাডারের ওপর নির্ভর করে না। হরাইজন এনগেজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলমেইদা জানান, “এটি সম্ভবত ইরানের আগের কোনো স্বল্পপাল্লার সমরাস্ত্রের অত্যন্ত উন্নত ও আধুনিক সংস্করণ। এতে রাডারের বদলে ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল বা তাপ শনাক্তকরণ (হিট-সিকিং) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য এমন এক ‘পপ-আপ’ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা, যা খুব সহজে এবং দ্রুত যেকোনো জায়গায় মোতায়েন করা যায়।”
যুদ্ধের অর্থনৈতিক কৌশল বদলে দিচ্ছে ইরান
পশ্চিমা সামরিক বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বা ‘অকার্যকর’ বলে উড়িয়ে দিলেও বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ইরান অন্য বার্তা দিচ্ছে। ফ্রান্সের সায়েন্সেস পো ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেন, “ইরানের সামরিক কৌশল মূলত সহনশীলতা, ধৈর্য ও গতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। আমার মনে হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অভিযানের সাফল্য নিয়ে একটু বেশিই বাড়িয়ে বলছে। শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্রে ইরান আসলে নিজেদের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করছে।”
একই সুর শোনা গেছে কিংস কলেজ লন্ডনের সিনিয়র লেকচারার মার্ক হিলবোর্নের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ইরানও এখন ক্ষেপণাস্ত্রের নকশায় সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। তারা যুদ্ধের অর্থনৈতিক কৌশলটাই বদলে দিচ্ছে। তাদের তৈরি করা সস্তা ও সাধারণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো এখন পশ্চিমাদের অত্যন্ত জটিল ও মিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক প্রযুক্তিকে অনায়াসে ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।”
আলোচনার টেবিলে ‘তুরুপের তাস’
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আলোচনার মধ্যেই এই সামরিক শক্তি প্রদর্শন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইরান স্পষ্ট করে দিতে চায় যে, হরমুজ প্রণালির আকাশ ও জলসীমার ওপর এখনো তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং আলোচনার টেবিলে তারা এটিকে ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গোপন সক্ষমতাসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার ছিল মূলত আমেরিকার জন্য একটি ‘সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত সতর্কবার্তা’। শান্তি আলোচনা যদি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, তবে ইরান যেকোনো নতুন আক্রমণ সামলাতে প্রস্তুত—এই ড্রোন ভূপাতিত করার মধ্য দিয়ে তেহরান সেই বার্তাই বিশ্বকে দিল।