২৯ মে, ২০২৬

আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার কাঁটাতার: পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে লাখো মানুষের ‘উদ্বাস্তু’ হওয়ার শঙ্কা

আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার কাঁটাতার: পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে লাখো মানুষের ‘উদ্বাস্তু’ হওয়ার শঙ্কা

পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত লাগোয়া হাকিমপুরের বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠেছে চার বছর বয়সী এক ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না আর তার মায়ের চাপা দীর্ঘশ্বাসে। কোলকাতা থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই সীমান্ত চৌকিতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই সেখানে শুরু হয়েছে এক মানবিক বিপর্যয়। নথিপত্রহীন অভিবাসী ও কথিত অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের সম্ভাব্য কঠোর দমনপীড়ন ও ধরপাকড়ের আতঙ্কে হাজারো মানুষ এখন ভিড় করছেন সীমান্ত এলাকায়, উদ্দেশ্য—যেকোনো উপায়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দুই দেশের উন্মুক্ত সীমান্ত এবং ইছামতি নদীর অববাহিকা দিয়ে রাতের অন্ধকারে মরিয়া হয়ে পারাপারের চেষ্টা করছেন অনেকে। তবে এই যাত্রার পেছনে রয়েছে এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি এবং রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার চরম আতঙ্ক।

ক্ষমতার রাজনীতি ও ‘আটককেন্দ্রের’ আতঙ্ক
চলতি মে মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। নির্বাচনি প্রচারণায় তাদের প্রধান প্রতিশ্রুতিই ছিল নথিপত্রহীন অভিবাসীদের ‘শনাক্তকরণ, তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং ফেরত পাঠানো’। ক্ষমতায় আসার পরপরই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।

গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কথিত ‘অবৈধ বিদেশি’ ও রোহিঙ্গাদের জন্য ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা অস্থায়ী আটককেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ জারি করেছে। এই একটি নির্দেশই রাজ্যের প্রায় সাড়ে তিন কোটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে। পার্শ্ববর্তী আসাম রাজ্যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কেবল জাতিগত ও ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে যেভাবে শত শত মানুষকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, সেই স্মৃতি এখনো মানুষের মনে টাটকা। ফলে আসামের সেই ভয়াবহতা এবার পশ্চিমবঙ্গেও আছড়ে পড়ার ভয়ে ঘরবাড়ি ছাড়ছেন অনেকে।

‘যাব কোথায়?’: পরিচয়হীনতার উভয়সংকট
সীমান্তে অপেক্ষমাণ ৪৫ বছর বয়সী হাসিনা বিবি তাঁর স্বামীকে নিয়ে এক নির্মাণাধীন ভবনের কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছেন। স্বামীর হাতে থাকা শেষ রুটির টুকরোটি দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছেন ক্ষুধার্ত সন্তানকে। হাসিনা বিবি জানান, "আমাদের অবিলম্বে ভারত ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। না গেলে চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে।"

কিন্তু এই ফেরার পথও মসৃণ নয়। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও রাজ্য পুলিশ তাদের আটকে রেখে প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের পর বাংলাদেশে পুশব্যাকের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ ওদিকে, বৈধ বা আনুষ্ঠানিক নাগরিকত্বের প্রমাণ ছাড়া বাংলাদেশ সরকার কাউকেই গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ফলে এক অদ্ভুত ও নির্মম উভয়সংকটে পড়েছেন এই প্রান্তিক মানুষেরা।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার তরুণ প্রজন্ম। ২০ বছর বয়সী আব্দুল শেখের জন্ম কোলকাতায়। দুই দশক আগে তাঁর মা-বাবা বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছিলেন। মা-বাবার মৃত্যুর পর এখন তাঁর কাছে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের কোনো কাগজ নেই। আব্দুল অশ্রুসজল চোখে প্রশ্ন করেন, "আমার সব আশা ভেঙে গেছে। আমি যে বাংলাদেশি, সেটাই বা কীভাবে প্রমাণ করব? আমি এখন কোন দেশের নাগরিক?"

কাঁটাতারের ওপারে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ঐতিহাসিকভাবেই ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামের পর থেকে এই সীমান্ত অঞ্চলে মানুষের যাতায়াত ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তির এক দীর্ঘ সংযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই মানুষগুলো ভারতের শ্রমবাজারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থেকেছেন। কিন্তু রাতারাতি বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণে তারা এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই জোরপূর্বক বহিষ্কার এবং আইনি সুরক্ষাহীনতার বিষয়ে ভারতকে বারবার সতর্ক করছে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কেবল সন্দেহের বশে মানুষকে তাড়িয়ে দেওয়া বৈশ্বিক মানবাধিকার সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন অধিকারকর্মীরা।

সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া আর নদীর স্রোতের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ এখন কোন দিকে মোড় নেবে, তা কেউ জানে না। এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে চেয়ে শুধু দিন গুনছেন হাসিনা বিবি আর আব্দুল শেখদের মতো হাজারো ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষ।