২৭ মে, ২০২৬

সমীক্ষা ছাড়া ১৩৩ কোটির প্রকল্প: ধুলো জমছে হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারের আধুনিক পশু জবাইখানায়

সমীক্ষা ছাড়া ১৩৩ কোটির প্রকল্প: ধুলো জমছে হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারের আধুনিক পশু জবাইখানায়

আধুনিক বহুতল ভবন, বিশাল প্রবেশদ্বার এবং গবাদিপশু ওঠানামার জন্য রয়েছে পৃথক ও সুপরিসর র‍্যাম্প। ভবনের ভেতরে সাজানো কোটি কোটি টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি। অথচ ঢাকাবাসীকে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ মাংস সরবরাহের উদ্দেশ্যে নির্মিত এই অবকাঠামোগুলো বছরের পর বছর ধরে পুরোপুরি অচল। জমেছে ধুলোবালির মোটা আস্তরণ।

রাজধানীর হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্মিত দুটি আধুনিক পশু জবাইখানার বাস্তব চিত্র এটি। কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ অলস পড়ে থাকলেও, রাজধানীজুড়ে এখনো অস্বাস্থ্যকর ও সনাতন পরিবেশেই চলছে পশু জবাই।

উদ্বোধন হলেও সাত বছরে জবাই হয়নি একটি পশুও!
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের আগস্টে ৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে হাজারীবাগ পশু জবাইখানার নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২০ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, ২০১৯ সালেই তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন এটি তড়িঘড়ি করে উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের দিন প্রতীকী হিসেবে একটি গরু জবাই করা হলেও, গত সাত বছরে সেখানে আর কোনো পশু জবাই করা হয়নি। অথচ এই কেন্দ্রের ঘণ্টায় ৩০টি গরু ও ৬০টি ছাগল প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে এই আধুনিক ভবনের মূল ফটক তালাবদ্ধ এবং এর ঠিক সামনেই বসেছে কোরবানির পশুর হাট।

অনুরূপ দশা ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কাপ্তানবাজার পশু জবাইখানারও। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই কেন্দ্রে ঘণ্টায় ১৪টি গরু এবং ৩০টি ছাগল জবাইয়ের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এটিও উদ্বোধনের পর থেকে অচল পড়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (feasibility study) ছাড়াই মোট ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই দুটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল।

সচল না হওয়ার মূল কারণ: ইজারা সংকট ও বাজার বাস্তবতা
জবাইখানা দুটি চালু করতে না পারার পেছনে ডিএসসিসির দূরদর্শিতার অভাব এবং অবাস্তব ইজারামূল্যকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। হাজারীবাগের জবাইখানাটি ৩ বছরের জন্য প্রথমে সাড়ে ৮ কোটি এবং পরে কমিয়ে সোয়া ৬ কোটি টাকা ইজারামূল্য ধরা হলেও কোনো দরপত্র জমা পড়েনি।

ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে মাংস বিক্রেতারা কোনো ধরনের অতিরিক্ত ফি বা পরিবহন খরচ ছাড়াই নিজেদের দোকানের সামনে বা স্থানীয় বাজারের পাশে পশু জবাই করছেন। ফলে কোটি টাকা খরচ করে এই আধুনিক জবাইখানা পরিচালনার দায়িত্ব নিতে কোনো ইজারাদার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এই সুযোগে 'পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন' উপেক্ষা করে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই দেদারসে বিক্রি হচ্ছে মাংস, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

নতুন কমিটি ও সচল করার প্রত্যয়
সম্প্রতি এই অচল জবাইখানা দুটি সচল করতে একটি নতুন কমিটি গঠন করে অফিস আদেশ জারি করেছে ডিএসসিসি। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন,

"কীভাবে এই আধুনিক পশু জবাইখানা দুটি চালু করা যায়, তা নিয়ে আমরা গুরুত্বের সাথে ভাবছি। যেভাবেই হোক, এই দুটি স্থাপনাকে আমরা দ্রুত সচল করব।"

সংকট উত্তরণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
কাগুজে কমিটি বা ধীরগতির আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দিয়ে এই অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন নগর-বিশেষজ্ঞরা। এই কোটি টাকার প্রকল্প দুটিকে সচল করতে তারা মূলত ৪টি পরামর্শ দিয়েছেন:
১. স্বাধীন কারিগরি নিরীক্ষা: নতুন কোনো খরচের আগে যন্ত্রপাতি সচল আছে কি না এবং মাসিক পরিচালন ব্যয় কেমন হবে, তা স্বাধীন অডিটের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
২. রাজস্বের লোভ ত্যাগ: শুরুতে ইজারা থেকে আয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে কম ফি, ভর্তুকি বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (PPP) এটি চালু করতে হবে।
৩. পাইলট প্রজেক্ট: পুরো ঢাকা নিয়ে না ভেবে হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারের আশপাশের নির্দিষ্ট কিছু বাজারকে বাধ্যতামূলকভাবে এই জবাইখানার আওতায় এনে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করা উচিত।
৪. আইন প্রয়োগ: জবাইখানায় সুযোগ-সুবিধা সহজ করার পাশাপাশি উন্মুক্ত স্থানে বা ফিটনেস সনদ ছাড়া মাংস বিক্রি বন্ধে ধাপে ধাপে কঠোর অভিযান চালাতে হবে।

এই প্রকল্প নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বিশিষ্ট নগর-পরিকল্পনবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন:

"হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারের জবাইখানা এখনো বাঁচানো সম্ভব। তবে কাগুজে কমিটি দিয়ে নয়। বাস্তবসম্মত ব্যবসা মডেল, আইন প্রয়োগ, বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত ডিএসসিসির ব্যর্থতার স্মারক হয়েই থাকবে।"